নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘নাটোর লজ’কে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস-সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, একসময় নাটোর রাজপরিবারের প্রশাসনিক ও আবাসিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই ঐতিহাসিক ভবনটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও নানা অনিয়ম, জালিয়াতি ও বিতর্কিত কাগজপত্রের মাধ্যমে এর মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশে ‘রয়েল মালেকা নূর ক্যাসেল’ নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, নাটোর রাজপরিবারের জমিদারি বিস্তৃত ছিল অবিভক্ত বাংলার বিশাল অঞ্চলজুড়ে। রানী ভবানীর সময় থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুকুরিয়া পরগণাসহ বেশ কিছু এলাকা নাটোর এস্টেটের আওতাভুক্ত ছিল। এসব এলাকার প্রশাসনিক কার্যক্রম, খাজনা আদায় ও জমিদারি তদারকির সুবিধার্থে ময়মনসিংহ শহরে নাটোর রাজপরিবার একটি আবাসিক ও প্রশাসনিক ভবন প্রতিষ্ঠা করে, যা স্থানীয়ভাবে ‘নাটোর লজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের বিপরীতে ২ নম্বর মৃত্যুঞ্জয় স্কুল রোডে অবস্থিত এই ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, শশী লজ, আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল ও গৌরীপুর লজের মতোই নাটোর লজও একসময় শহরের অন্যতম অভিজাত স্থাপনা ছিল।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ভবনটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে যায় বলে বিভিন্ন মহলের দাবি। পরবর্তীতে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠানের কাছে সম্পত্তিটি লিজ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়।
তবে সম্প্রতি স্থানীয় নাগরিক সমাজের একাংশ অভিযোগ তুলেছেন যে, অর্পিত ও লিজকৃত এই সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে জাল দলিল, ভুয়া নথিপত্র, বিতর্কিত নামজারি এবং মামলার রায়-ডিক্রি ব্যবহার করে মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নূরউদ্দিন নামের এক ব্যক্তির পুত্র মঈনউদ্দীন কবীরকে সম্পত্তির মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, সম্পত্তিটির একটি অংশ ইতোমধ্যে বিক্রি করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা শফিক উল্লাহর তত্ত্বাবধানে ‘রয়েল মালেকা নূর ক্যাসেল’ নামে ১৪ তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ইতিহাস-সচেতন নাগরিক, সংস্কৃতিকর্মী ও নগরবাসীর একাংশের মত, যদি প্রকৃতপক্ষে এটি অর্পিত সম্পত্তি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা হয়ে থাকে, তবে এর মালিকানা ও কাগজপত্রের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পত্তিটির সকল দলিল, নামজারি, রেকর্ড ও আদালতের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
নগরবাসীর দাবি, কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বাতিল করে জমিটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা হোক। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় স্থাপনাটির স্মৃতি সংরক্ষণ, ভূমি জাদুঘর স্থাপন অথবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, আদালতের নথি এবং ভূমি রেকর্ড সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও যাচাই-বাছাই অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে বিষয়টি স্থানীয় জনমনে ব্যাপক আলোচনা ও আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য করুন