নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট: সিলেট জেলা ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে পরিবহন থেকে নগদ অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) শাহাব উদ্দিন। একাধিক সূত্রের দাবি, মামলা না দিয়ে ভুয়া রশিদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সড়কে যানবাহন আটক করে নগদ অর্থের বিনিময়ে মামলা এড়িয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি চালু ছিল, জুলাই বিপ্লবের পর সরকার পরিবর্তনের পর তা অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে কাগজপত্রবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অনলাইন মামলা দেওয়ার বিধান কার্যকর হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, সিলেট জেলা ট্রাফিক পুলিশ সরকারি নিয়ম অনুসরণ না করে নিজেদের তৈরি জরিমানার বুক ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ে অর্থ আদায় করছে। জেলার বিভিন্ন থানায় কর্মরত ১৮ জন সার্জেন্ট ও ট্রাফিক সার্জেন্ট ইন্সপেক্টর (টিএসআই)-এর ওপর দৈনিক প্রায় ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন আদায়কৃত অর্থের হিসাব WhatsApp-এর মাধ্যমে টিআই শাহাব উদ্দিনের কাছে পাঠাতে হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট সার্জেন্ট ও টিএসআইদের তিরস্কারের মুখে পড়তে হয়। এমনকি প্রতিদিন সকালে তার পক্ষ থেকে বার্তার মাধ্যমে লক্ষ্য পূরণের নির্দেশনা দেওয়া হয় বলেও জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকির জন্য সার্জেন্ট ও টিএসআইদের পেছনে নিজস্ব লোক নিয়োজিত রাখা হয়েছে। এছাড়া মাস শেষে আদায়কৃত অর্থের একটি বড় অংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। সিলেট পুলিশ সুপার কার্যালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, বর্তমান পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক এর আগে গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় টিআই শাহাব উদ্দিনও গাজীপুরে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে সিলেটে বদলির পর শাহাব উদ্দিনকে সেখানে আনা হয় বলে সূত্রটির দাবি।
সিলেটের একাধিক পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে যানবাহন থামিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ট্রাফিক সদস্যও দাবি করেছেন, চাকরি রক্ষার স্বার্থে তারা অনেক সময় ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ পালন করতে বাধ্য হন। একাধিক সূত্রের দাবি, সম্প্রতি জকিগঞ্জে যানবাহন আটক করে মামলা ছাড়াই প্রায় ৮৫ হাজার টাকা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক। তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর সিলেটে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল। আমি যোগদানের পর তা পুনরায় চালু করা হয়েছে।” হাতে লেখা রশিদ ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান এবং অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. জিল্লুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, অভিযোগ রয়েছে যে টিআই শাহাব উদ্দিন একটি প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন। তবে গাড়িটির অর্থের উৎস বা মালিকানা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।প্রতিবেদকের দাবি, এ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
মন্তব্য করুন