admin 1
৩ জুন ২০২৬, ৫:০১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রাজনীতির আড়ালে অপরাধের সাম্রাজ্য: ময়মনসিংহে চিহ্নিত নেত্রীদের বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রকাঠামোর অবক্ষয়

                                                                           কলমে: ময়মনসিংহের সচেতন যুবসমাজ

যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার। কিন্তু যখন রাজনীতির পবিত্র অঙ্গনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সমাজের কতিপয় ব্যক্তি অপরাধের অভয়ারণ্য গড়ে তোলে, তখন সেই সমাজব্যবস্থা দ্রুত একটি অসভ্য ও বর্বর কাঠামোতে পরিণত হয়। ময়মনসিংহের সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা আমাদের, অর্থাৎ স্থানীয় যুবসমাজকে, গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আমরা দেখছি কীভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পদবি ব্যবহার করে অপরাধের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে এবং কীভাবে আইনের রক্ষকেরা সেই অপরাধীদের সামনে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছেন।
৩ নং ওয়ার্ডের ‘কিলার’ নেত্রী এবং অপরাধের বহুমুখী সিন্ডিকেট সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট তথ্যাদির ভিত্তিতে ময়মনসিংহের ৩ নং ওয়ার্ডের মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের যে অপরাধনামা উন্মোচিত হয়েছে, তা যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে শিউরে ওঠার জন্য যথেষ্ট। স্থানীয় প্রভাবশালী ‘আলম মিয়া’-এর ছত্রছায়ায় এই নেত্রী পুরো এলাকাটিকে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা নয়। তিনি এলাকায় নারী ব্যবসা বা দেহব্যবসার একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালনা করছেন, যা আমাদের যুবসমাজের নৈতিক স্খলনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি, এলাকায় মাদকের অবাধ বিস্তার, সাধারণ মানুষের বৈধ জমি জোরপূর্বক দখল এবং সংঘবদ্ধ ডাকাতির মতো ভয়াবহ অপরাধের মূল হোতা হিসেবে তাঁর নাম উঠে এসেছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়টি হলো, সম্প্রতি ডিবি পুলিশের একটি সফল অভিযানে এক চাঞ্চল্যকর ডাকাতি মামলার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। জনৈক চাচার হোটেলের মালিকের বাসায় সংঘটিত ওই ডাকাতির ঘটনায় উদ্ধারকৃত ২,৮৭,০০০ টাকার সাথে এই নেত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত প্রমাণাদিতে দেখা যায়, এই ডাকাতির মূল হোতা হয়েও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন।
রাজনীতির লেবাসে ব্ল্যাকমেইল, নারী ব্যবসা ও ভয়ংকর মাফিয়া সিন্ডিকেট ৩ নং ওয়ার্ডের এই নেত্রীর ঘটনাই ময়মনসিংহে একমাত্র নয়; এটি মূলত একটি বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক পচনের ক্ষুদ্র অংশ। রাজনীতির আড়ালে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এই ভয়ংকর সংস্কৃতি অন্যান্য নেত্রীদের মাঝেও প্রবলভাবে বিদ্যমান, যা রীতিমতো সংঘবদ্ধ মাফিয়া চক্রের রূপ নিয়েছে।

এর সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ হলো ময়মনসিংহ জেলা যুব মহিলা লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক স্বপ্না খন্দকার এবং তার প্রধান সহযোগী শেরপুরের নকলা নিবাসী মেহেদীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য। প্রাপ্ত তথ্য ও ডিজিটাল রেকর্ড থেকে জানা যায়, মেহেদী নামক এই ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে স্বপ্না খন্দকারের সাথে যৌথভাবে এলাকায় নারী ও মাদক ব্যবসার এক ভয়াবহ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছিল। এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমেই মেহেদী রাতারাতি কোটিপতি বনে যায়।

স্বপ্না খন্দকার ও মেহেদী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো চরম অমানবিক। রাজনীতি করার সুবাদে স্বপ্না খন্দকার অন্য নারীদের নিজের বাসায় ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করতেন এবং পরে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিলেন। মেহেদীর মতো পার্টনারদের নিয়ে গড়ে তোলা এই সিন্ডিকেটের প্রধান কাজই ছিল সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়া। নারীপাচার, দেহব্যবসা এবং জঘন্য মাদক ব্যবসার মাধ্যমেই তারা শহরে একাধিক বাড়ি, গাড়ি ও বিপুল অবৈধ ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হয়েছেন।

একইভাবে, হালুয়াঘাটের উপজেলা মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক আসমাউল হুসনা শিমুল জেলা পরিষদের সদস্য থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। মুক্তাগাছা উপজেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসরাত জাহান তনুও ছাত্র-জনতার ওপর হামলা এবং অফিস ভাঙচুরের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পদবিগুলো কীভাবে একেকটি অপরাধী চক্রের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি: একটি অসভ্য সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি আমাদের যুবসমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গাটি হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ বা Culture of Impunity। প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্বৈত নীতি আজ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আমরা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী বা পদবিবিহীন নিরীহ যুবকদের পুলিশ সামান্য সন্দেহের বশেই গ্রেপ্তার করে হয়রানি করে। অথচ, ডাকাতি, নারী ব্যবসা এবং মাদকের মতো জঘন্যতম অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও ৩ নং ওয়ার্ডের ওই মহিলা লীগ নেত্রী কিংবা স্বপ্না খন্দকার-মেহেদী সিন্ডিকেট কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান? পুলিশ প্রশাসন কি বিক্রি হয়ে গেছে? অপরাধের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার পরও শুধু ক্ষমতাসীন দলের পদবি থাকায় তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে।

যখন চিহ্নিত অপরাধীরা সমাজের বুকে বুক ফুলিয়ে হাঁটে এবং প্রশাসন নীরব থাকে, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনে। এটি শুধু আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাই ধ্বংস করে না, বরং যুবসমাজকে এই ভুল বার্তা দেয় যে—ক্ষমতা এবং পেশিশক্তি থাকলে যেকোনো অপরাধ করেই পার পাওয়া সম্ভব। এই বিচারহীনতা সমাজকে একটি ‘অসভ্য’ বা ‘মৎস্যন্যায়’ ব্যবস্থায় পর্যবসিত করে, যেখানে দুর্বলের কোনো অধিকার থাকে না এবং অপরাধীরাই সমাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।

আমাদের দাবি ও গঠনমূলক রূপরেখা
একটি সুস্থ, সুন্দর এবং নিরাপদ ময়মনসিংহ গড়ার লক্ষ্যে স্থানীয় যুবসমাজ হিসেবে আমাদের সুস্পষ্ট দাবিগুলো হলো:
১. দ্রুততম গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ডাকাতি, নারী ব্যবসা ও ভূমি দখলের সাথে যুক্ত ৩ নং ওয়ার্ডের ওই নেত্রী এবং ভয়ংকর ব্ল্যাকমেইলিং ও মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা স্বপ্না খন্দকার ও তার পার্টনার নকলার মেহেদীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা: অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার পেছনে প্রশাসনের যেসব অসাধু কর্মকর্তা জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। পুলিশকে রাজনৈতিক দলের কর্মীর বদলে রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
৩. পরিচ্ছন্ন রাজনীতি: রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সংস্কার করতে হবে। কোনো অপরাধী, চাঁদাবাজ বা ব্ল্যাকমেইলার যেন রাজনৈতিক দলের পদবি ব্যবহার করে সমাজের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কঠোর হতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ এবং সুশাসন। এই বিচারহীনতার অসভ্য সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অন্ধকার ও নৈরাজ্যকর রাষ্ট্রের উত্তরাধিকারী হবে। আমরা চাই অবিলম্বে এই অপরাধীদের জেলখানায় পাঠানো হোক এবং ময়মনসিংহে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হোক।

মন্তব্য করুন

[wpdevart_facebook_comment curent_url="https://deshreport24.com/archives/5289" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান ১ দিনের রিমান্ডে

১

শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

২

এন্টি টেররিজম ইউনিটের নতুন পরিচয় ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’

৩

ডেল্টা লাইফের পৌনে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতি: আইন উপদেষ্টা ঝালকাঠী’র মোঃ মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

৪

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন

৫

চিরিংগা হাইওয়ে ওসির বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও টোকেন বাণিজ্য: প্রতিবাদে শ্রমিকদের মানববন্ধন, দম্ভোক্তি ‘উর্ধ্বতনদের টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করি’

৬

ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল: আকুয়া ভূমি অফিসে হাশেমের রাজত্ব, জিম্মি সেবাগ্রহীতারা!

৭

‘খুব শিগগিরই’ শেষ হতে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প

৮

মাথার ওপর ঝুলছে মরিচা ধরা রড, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা: চরম মৃত্যুঝুঁকিতে নকলা থানার পুলিশ সদস্যরা

৯

ময়মনসিংহে ট্রাফিক বিভাগের প্রসিকিউশন মুন্সি কনস্টেবল ফারুকের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও চালকদের চরম হয়রানির অভিযোগ

১০

জীবনের হিসাব থেকে মুছে যাওয়া গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাড়ে ১৭টি বছর

১১

ঘুষে পোস্টিং ও জ্বালানি কেলেঙ্কারির অভিযোগে হাইওয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর মাহবুবুল

১২

রাড্ডায় হামলা-লুটপাট, ওসি প্রত্যাহার

১৩

ঈশ্বরগঞ্জে অনলাইন জুয়ার অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

১৪

জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক, আ.লীগের শতাধিক নেতাকর্মী আটক

১৫

ফ্যাসিবাদের দোসরদের গ্রেপ্তার করলে পুলিশকে পুরস্কৃত করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

পাহাড়ে অধিকারবঞ্চনার বহুমাত্রিক ফাঁদ: পরিবহন থেকে পানি সবখানেই আদিবাসীদের বাদ রাখার প্রশাসনিক কৌশল

১৭

ক্রসফায়ার ও জুলাই গণহত্যার রূপকার এডিসি জাহাঙ্গীর ও এসি মাসুম: একজন পালালেও অন্যজন বহাল তবিয়তে

১৮

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে সংঘর্ষে নিহত ২

১৯

হবিগঞ্জে মাদকসহ তিনজন আটক

২০