গাড়ি আটকে অর্থ আদায়
• প্রতি মাসে ৪০০ টাকার টোকেন সিন্ডিকেট
• সরকারি মোটরসাইকেল না চালিয়েও তেল তোলার গুরুতর অভিযোগ
• অপসারণ ও তদন্তের দাবি
চট্টগ্রাম থেকে ফিরে বিশেষ প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের চকরিয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে গাড়ি আটক, অবৈধ টোকেন বাণিজ্য এবং লাগামহীন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকরা। চিরিংগা হাইওয়ে থানার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুবুল হক ভূইয়ার নানা অনিয়ম, হয়রানি ও জিম্মি বাণিজ্যের প্রতিবাদে মহাসড়কে নেমে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ভুক্তভোগী চালক ও শ্রমিকরা। গতকাল বিকেল ২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া পৌরশহরের বাঁশঘাট রাস্তার মাথায় এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন রুটের শত শত পরিবহন শ্রমিক অংশ নেন।
মাসে ৪০০ টাকার ‘টোকেন সিন্ডিকেট’, টাকা না পেলেই মামলা
মানববন্ধনে পরিবহন শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, চিরিংগা হাইওয়ে থানার ইনচার্জ হিসেবে মাহবুবুল হক ভূইয়া যোগদানের পর থেকেই মহাসড়কে পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ফেলেছেন। গাড়ি আটক না করার শর্তে যানবাহনপ্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে টোকেন ফি নেওয়া হয়। কিন্তু সেই চাঁদা পরিশোধ করার পরও সড়কে গাড়ি থামিয়ে নিয়মিত চালক-হেলপারদের নানা কৌশলে হয়রানি করা হচ্ছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মহাসড়ক থেকে গাড়ি ধরে থানায় নেওয়ার পর শুরু হয় অনৈতিক দর-কষাকষি। তাদের বেঁধে দেওয়া শর্ত ও চাহিদামতো টাকা না দিলে জুড়ে দেওয়া হয় কঠিন ধারার মামলা। আর সমঝোতা অনুযায়ী পকেট ভারী হলেই ‘সাত খুন মাফ’—ছেড়ে দেওয়া হয় গাড়ি। দিনে আটক করে রাতে এবং রাতে আটক করে দিনে ছাড়ার এক অদ্ভুত মুক্তিপণ বাণিজ্য চলছে বলে চালকরা অভিযোগ করেন।
আজিজনগর থেকে ঝঁনঝঁনিয়া ব্রীজ: মহাসড়কে জোরজুলুমের রাজত্ব
বক্তারা জানান, চট্টগ্রাম জেলা থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার প্রবেশমুখ আজিজনগর ওয়েলকাম গেইট থেকে ফাঁসিয়াখালীর ঝঁনঝঁনিয়া ব্রীজ পর্যন্ত পুরো মহাসড়কটি এখন চালকদের জন্য আতঙ্কের নাম। নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সেখানে চলছে প্রকাশ্য জোরজুলুম। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকজন দালাল ও কথিত শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ইনচার্জ মাহবুবুল হক। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই মহাসড়ক থেকে বৈধ-অবৈধ সব ধরনের গাড়ি টার্গেট করে আটক করা হয় এবং রাতের আঁধারে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে তা ছেড়ে দেওয়া হয়।
অফিসারের দম্ভোক্তি: ‘যা পারেন লিখেন, টাকার ভাগ উর্ধ্বতনদের যায়’
মানববন্ধনে তোলা এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ইনচার্জ মাহবুবুল হক ভূইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাম্ভিকতার সাথে বলেন, “আপনি সাংবাদিক, যা পারেন লিখেন। আমার কিছুই হবে না। কারণ এসব টাকার ভাগ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতি মাসে পাঠানো হয়।” একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন প্রকাশ্য দম্ভোক্তিতে হতবাক সচেতন মহল।
সরকারি মোটরসাইকেলের তেল চুরির অভিযোগ
এদিকে ইনচার্জ মাহবুবুল হক ভূইয়ার বিরুদ্ধে সরকারি জ্বালানি অপচয় ও দুর্নীতির আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। তার ব্যবহৃত সরকারি মোটরসাইকেলটি (ঢাকা মেট্রো-ল ২২-৯১৮৩) বছরে এক ঘণ্টাও সরকারি কাজে সড়কে চলে না বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ উঠেছে। অথচ গাড়িটি ব্যবহার না করেই নিয়মিত ভুয়া লগবই তৈরি করে সরকারি তহবিলের তেল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
মানববন্ধনে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা অবিলম্বে চিরিংগা হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মাহবুবুল হক ভূইয়াকে প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি জানান। তারা বলেন, গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ ও নীতিহীন কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে গোটা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে তার দুর্নীতি ও সম্পদ অর্জনের উৎস খতিয়ে দেখে তাকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ চালকরা
মন্তব্য করুন