বিশেষ অনুসন্ধান : পর্ব ১৯
বিশেষ প্রতিবেদক: ফেসবুক আইডি হ্যাক হলে থানায় গিয়ে উল্টো ‘টেকনিক্যাল ফি’র দাবি, সন্তানকে একনজর দেখতে থানাকে ‘খুশি’ করার শর্ত, কিংবা মহাসড়কে পচনশীল পণ্যের ট্রাক আটকে নগদ অর্থ আদায়—তৃণমূল থেকে বিশেষায়িত ইউনিট, সর্বত্রই সেবার নামে নানা কৌশলে চলছে হয়রানি। সাইবার সেল, হাইওয়ে, শিল্প পুলিশ থেকে শুরু করে পিবিআই ও সিআইডির মতো বিশেষায়িত সংস্থার কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে সাধারণ মানুষ কীভাবে ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
১. সাইবার অপরাধ ও আইডি রিকভারির গোপন কারবার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ফেসবুক পেজ হ্যাক হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়ে অনেকে আর্থিক দাবির মুখে পড়ছেন।
* আইডি উদ্ধারে অনানুষ্ঠানিক ‘ফি’: থানায় অফিশিয়ালি তদন্ত শুরু করার বদলে সাইবার সেলের নির্দিষ্ট কিছু সদস্য অনানুষ্ঠানিকভাবে পেজ বা আইডি ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অন্যায্য ‘টেকনিক্যাল চার্জ’ কিংবা উপঢৌকন দাবি করেন।
* ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার নারীদের অপবাদ: অনলাইনে নারী ও কিশোরীদের ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ধরন ও চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে সময়ক্ষেপণ করা হয়।
২. রেশন ও জ্বালানি বরাদ্দে ডিজিটাল ফাঁকি
পুলিশের অভ্যন্তরীণ বাজেট ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব নিচের সারির সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।
* মেসের খাবারে ভাগ বসানো: থানা ও পুলিশ লাইন্সের কনস্টেবল এবং জুনিয়র অফিসারদের জন্য নির্ধারিত মানসম্মত সরকারি রেশনের বরাদ্দ কাটছাঁট করা হয়। ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করে বরাদ্দের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
* ডিজিটাল ফুয়েল কার্ডে জালিয়াতি: জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা আনতে কাগজের কুপনের বদলে ই-ফুয়েল বা ডিজিটাল কার্ড চালু হলেও অনিয়ম থামেনি। নির্ধারিত পেট্রোল পাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে গাড়িতে কম তেল নিয়ে বাকি টাকা ভুয়া ভাউচারে ক্যাশ করার অপকৌশল এখনো চলছে।
৩. হাইওয়ে ও ট্যুরিস্ট পুলিশের নজর পণ্যবাহী ট্রাকে
মহাসড়কে নজরদারির সুযোগকে অনেক সময় অর্থ আদায়ের হাতিয়ার বানানো হয়।
* পচনশীল পণ্যের গাড়িতে চাপ: মাছ, ফলমূল বা শাকসবজিবাহী ট্রাক আটকে কাগজপত্রের ত্রুটির অজুহাত তোলা হয়। সময় নষ্ট হলে মাল নষ্ট হয়ে লোকসানের আশঙ্কায় পরিবহন চালকরা স্পটেই নগদ টাকা দিয়ে ছাড়পত্র নিতে বাধ্য হন।
* জরুরি বাতির বিভ্রান্তি: ব্যক্তিগত গাড়িতে জরুরি লাইট বা বিকন ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় জরিমানা না করে অপরাধীর মতো দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
৪. পারিবারিক বিরোধ ও শিশু মেলানো নিয়ে মধ্যস্থতা
পারিবারিক সুরক্ষা আইন অনুযায়ী কাজ না করে থানা পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে সালিশের নামে সমঝোতা বাণিজ্য চালানো হয়।
* যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলায় দরদাম: আদালতে যাওয়ার আগে আপসের কথা বলে স্বামী ও স্ত্রী উভয় পক্ষকে ডেকে নিয়ে সময়ক্ষেপণ এবং অনানুষ্ঠানিক আর্থিক রফা করার চেষ্টা চলে।
* সন্তান দেখার আইনি আদেশে বাধা: বিচ্ছেদের পর আদালত থেকে মা বা বাবার নির্দিষ্ট দিনে থানায় এসে সন্তানকে দেখার আদেশ থাকলেও সংশ্লিষ্ট ডিউটি অফিসারকে ব্যক্তিগতভাবে সন্তুষ্ট না করলে প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃত বিলম্ব ঘটানো হয়।
৫. শিল্প পুলিশের ভূমিকা ও শ্রমিক অসন্তোষ
শিল্পাঞ্চলের শৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে অনেক সময় কারখানার মালিকদের স্বার্থ রক্ষা প্রাধান্য পাওয়ার নজির রয়েছে।
* বকেয়া বেতনের আন্দোলনে বলপ্রয়োগ: কারখানা মালিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সুবিধা নিয়ে শান্তিপূর্ণ বকেয়া বেতনের আন্দোলনেও অতিরিক্ত লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের নামে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
* শ্রমিকদের তথ্য ফাঁস: কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন বা ন্যায্য অধিকার আদায়ে সক্রিয় শ্রমিক নেতাদের ওপর গোপনে নজরদারি চালিয়ে সেই তথ্য মালিকপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
৬. সিআইডি ও পিবিআইয়ের তদন্ত ঝুলিয়ে রাখা
অধিকতর তদন্তের জন্য গঠিত বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধেও দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ উঠছে।
* বছরের পর বছর ফাইলবন্দি তদন্ত: থানা পুলিশের ত্রুটিপূর্ণ বা পক্ষপাতমূলক তদন্তের পর আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডি বা পিবিআইকে দায়িত্ব দিলে লজিস্টিক সংকট ও কাজের চাপের অজুহাতে প্রতিবেদন মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়।
* ফরেনসিক ও ডিএনএ টেস্টের খরচ: সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও ডিএনএ ও ফরেনসিক ল্যাব রিপোর্ট দ্রুত আদালতে পাঠানোর নামে স্বজনদের কাছ থেকে যাতায়াত ও ব্যক্তিগত খরচের দাবি করা হয়।
উত্তরণের দুটি জরুরি সংস্কার
আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা নিরসনে বিশেষজ্ঞরা দুটি কাঠামোগত পরিবর্তনের তাগিদ দিচ্ছেন:
১. বিচার বিভাগের অধীনে স্বাধীন তদন্ত কমিশন: সিআইডি ও পিবিআইকে কেবল পুলিশ প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বিচার বিভাগের প্রত্যক্ষ তদারকিতে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী তদন্ত কমিশন হিসেবে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
২. থার্ড-পার্টি ওয়াচডগ ও সেন্ট্রাল ট্র্যাকিং: সাইবার অপরাধের জিডি এবং সাধারণ তদন্তের প্রতিটি ধাপ কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে সরাসরি ট্র্যাক করার ব্যবস্থা চালু করা, যাতে তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে কোনো ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখতে না পারেন।
মন্তব্য করুন