বিশেষ অনুসন্ধান : পর্ব ২০
বিশেষ প্রতিবেদক: দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান যমুনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি, আকাশসীমা নিরাপত্তা লঙ্ঘন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পথে বসানো এবং জনসাধারণের রাস্তা দখলের মতো গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকে দায়বদ্ধ (মর্টগেজ) জমি গোপনে বিক্রিচেষ্টা থেকে শুরু করে রাজধানীর নিরাপত্তা তোয়াক্কা না করে ড্রোন ওড়ানো—গ্রুপটির এমন বহু অপতৎপরতার তথ্য এবার অনুসন্ধানে প্রকাশ্যে এসেছে।
১. ব্যাংকে দায়বদ্ধ জমি গোপনে বিক্রির পাঁয়তারা ও দলিল জালিয়াতি
ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার সময় যেসব জমি ও স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক (Mortgage) হিসেবে জমা রাখা হয়েছিল, পরবর্তীতে সেই তথ্যাদি সম্পূর্ণ গোপন করে আইন ভেঙেছে যমুনা গ্রুপের একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অগোচরে দায়বদ্ধ জমি তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির চেষ্টা এবং ভুয়া দলিলের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নথিপত্র তৈরির অপচেষ্টা চালানো হয়। বিষয়টি নজরে এলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আনুষ্ঠানিক লিখিত আপত্তি জানায়, যার ফলে বড় ধরনের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পায় ক্রেতা ও ব্যাংক উভয় পক্ষই।
২. নো-ফ্লাই জোনে ড্রোন উড্ডয়ন: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘন
বাণিজ্যিক ফায়দা হাসিলে দেশের আকাশসীমার নিরাপত্তাবিধিকেও তোয়াক্কা করেনি গ্রুপটি। যমুনা ফিউচার পার্ক ও তাদের আবাসন প্রকল্পের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য স্পর্শকাতর এলাকায় বেআইনিভাবে ড্রোন চালানো হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই ‘নো-ফ্লাই জোন’ বা উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকায় উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা ও ড্রোন দিয়ে এরিয়াল শুটিং চালানো হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ড্রোন ও জাইরো প্যাকার জব্দ করে এবং সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল টিমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ ও কঠোর সতর্কতা দেয়।
৩. পোশাক খাতের ছোট সাব-কন্ট্রাক্টরদের বিল আটকে পথে বসানো
তৈরি পোশাক খাতে যমুনার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘যমুনা ডেনিমস’ ও তাদের সহযোগী গার্মেন্টসগুলোর বিরুদ্ধে উঠেছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শোষণের অভিযোগ। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে বড় বড় রফতানি আদেশ পাওয়ার পর তারা স্থানীয় ছোট ছোট পোশাক কারখানাকে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দিত।
কিন্তু কাজ শেষে মালামাল রফতানি হয়ে গেলেও স্থানীয় ক্ষুদ্র কারখানাগুলোর কোটি কোটি টাকার পাওনা আটকে রাখা হতো। ‘কাপড়ের মান খারাপ’ কিংবা ‘দেরিতে ডেলিভারি’র ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর বিল পরিশোধ না করায় বহু ছোট ডায়িং, সেলাই ও প্যাকেজিং কারখানা ঋণের দায়ে দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
৪. সরকারি সড়ক ও ড্রেন দখল করে কেমিক্যাল ড্রামের ভাগাড়
গাজীপুর ও সাভার শিল্পাঞ্চলে যমুনার কারখানার পাশে সরকারি পাকা সড়ক ও জনগুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ড্রেন দখল করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
কারখানা লাগোয়া সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে বিষাক্ত কেমিক্যাল ড্রাম, লোহালক্কড়ের স্ক্র্যাপ এবং বিপজ্জনক বর্জ্য রাখার খোলা ডিপো বানিয়ে রাখা হয়েছিল। এতে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হতো এবং জনসাধারণের চলাচল সম্পূর্ণ বিঘ্নিত হতো। পরবর্তীতে স্থানীয় সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ একাধিকবার বুলডোজার নিয়ে যৌথ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সড়ক ও ড্রেন দখলমুক্ত করতে বাধ্য হয়।
৫. ফিউচার পার্কে পার্কিং ও সার্ভিস চার্জে ব্যবসায়ীদের ওপর খড়্গ
রাজধানীর কুড়িলে অবস্থিত তাদের ফ্ল্যাগশিপ শপিংমল ‘যমুনা ফিউচার পার্ক’-এ একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়েই।
মলটিতে আগত গাড়ির পার্কিং ফি এবং দোকানদারদের রক্ষণাবেক্ষণ বা সার্ভিস চার্জ কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা কিংবা আলোচনা ছাড়াই দফায় দফায় অনৈতিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা ও জুলুমের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে দোকান মালিক সমিতি এবং ভুক্তভোগী সাধারণ ক্রেতারা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক লিখিত স্মারকলিপি জমা দিতে বাধ্য হন।
করপোরেট প্রভাব খাটিয়ে আইনকানুন ও জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এসব ঘটনা এখন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও সাধারণ মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আইন অমান্যকারী এসব করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে।
মন্তব্য করুন