বিশেষ অনুসন্ধান : পর্ব ১৫
বিশেষ প্রতিবেদক: আকাশে হাজার ফুট উঁচুতে ওড়ার সময় একটি উড়োজাহাজের বডি কিংবা ডানায় যদি সূক্ষ্মতম কোনো চিড় ধরে, তার পরিণতি হয় ভয়াবহ বিপর্যয়। অথচ রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে সেই জীবন-মরণ পরীক্ষার জায়গাটিতেই চালানো হয়েছে জঘন্য প্রতারণা। বোয়িং বহরের ধাতব কাঠামোর স্থায়িত্ব পরীক্ষা না করেই ভুয়া সার্টিফিকেট বসিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ানো হয়েছে। একই সাথে উড়োজাহাজের ভেতরের ওভেন-ট্রলি কেনাকাটা, ব্ল্যাক বক্সের ডাটা বিশ্লেষণ, এমনকি বিদেশের মাটিতে যাত্রী পরিবহনের বাসের ভুয়া ট্রিপ দেখিয়ে শত কোটি টাকা লুটে নিয়েছে একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে।
পরীক্ষা ছাড়াই কোটি টাকার ‘ভুয়া সার্টিফিকেট’
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নিয়ম অনুযায়ী, বিমানের বডি, ডানা ও ইঞ্জিনের ধাতব সহনশীলতা যাচাইয়ে নিয়মিত ‘নন-ডেস্ট্রাক্টিভ টেস্টিং’ (এনডিটি), অতিবেগুনি রশ্মি ও আল্ট্রাসনিক টেস্ট করা বাধ্যতামূলক।
নথিপত্রে দেখানো হয়েছে—বিদেশি অনুমোদিত ল্যাব ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যয়িত পরিদর্শকদের এনে প্রতিটি উড়োজাহাজে নিবিড় পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এর বিপরীতে নিয়মিত পাস হয়েছে কোটি কোটি টাকার বিল। কিন্তু অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে নগ্ন সত্য: বাস্তবে কোনো গভীর ও কার্যকর এনডিটি পরীক্ষাই করা হয়নি। স্রেফ কিছু ভুয়া সনদ ও টেকনিক্যাল ছাড়পত্রের স্টিকার লাগিয়ে উড়োজাহাজগুলোকে বছরের পর বছর আকাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, যা আকাশপথে হাজারো যাত্রীর নিরাপত্তাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
রিফার্বিশড ওভেন কিনে নতুন পণ্যের বিল
যাত্রীদের খাবার ও ইন-ফ্লাইট সার্ভিসের আড়ালেও চলেছে লুটতরাজ। কেবিনে খাবার গরম করার জন্য বিশেষ এভিয়েশন ওভেন এবং খাবার বহনের ‘গ্যালি ট্রলি’ ক্রয়ের টেন্ডারে ঘটে চরম জালিয়াতি। বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যের সাধারণ থার্ড-পার্টি ও পুরোনো ‘রিফার্বিশড’ ওভেন কিনে নথিপত্রে দেখানো হয় নামিদামি মূল প্রস্তুতকারকের (ওইএম) ব্র্যান্ড-নিউ ইকুইপমেন্ট। উচ্চমূল্যের ভুয়া ভাউচার বানিয়ে পণ্যের আসল মূল্যের কয়েকগুণ টাকা আত্মসাৎ করেছে সংশ্লিষ্ট কেনাকাটা সিন্ডিকেট।
ব্ল্যাক বক্স ও ফ্লাইট ডেটার নামে কাগুজে খরচ
প্রতিটি ফ্লাইটের গতিবিধি, ইঞ্জিনের আচরণ ও ককপিটে পাইলটদের ফ্লাইট প্যাটার্ন পর্যালোচনার জন্য ব্ল্যাক বক্স টেকনিক্যাল ডাটা প্রসেসিং ও বিশেষ ‘ফ্লাইট ডাটা অ্যানালাইসিস’ (এফডিএ) সফটওয়্যার ক্রয় চুক্তিতে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানো হয়। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এই সফটওয়্যারের কার্যকর সেবা পুরোপুরি গ্রহণই করা হয়নি। তা সত্ত্বেও নিয়মিত লাইসেন্স ফি ও ট্র্যাকিং চার্জের নামে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা নির্দিষ্ট বিদেশি সার্ভিস প্রোভাইডারদের অনুকূলে ছাড় করা হয়েছে।
বিদেশের মাটিতে বাসের কৃত্রিম ট্রিপ বাণিজ্য
বিমানের দুর্নীতির থাবা ছড়িয়েছে বিদেশের মাটিতেও। যেসব বিদেশি বিমানবন্দরে বিমানের বহর সরাসরি বোর্ডিং ব্রিজে না ভিড়ে রানওয়ের দূরে ‘অ্যাপ্রোন’-এ দাঁড়াত, সেখানে যাত্রীদের টার্মিনাল ভবনে নেওয়ার বাস ভাড়ার চুক্তিতে বড় ধরনের ঘাপলা করা হয়। একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য স্বাভাবিকভাবে ১-২টি বাসের প্রয়োজন হলেও খাতায়-কলমে দেখানো হতো ৩ থেকে ৪টি বাস এবং একাধিক অতিরিক্ত ট্রিপ। এই কাগুজে অতিরিক্ত বাস ভাড়ার অর্থ স্টেশন প্রতিনিধিদের যোগসাজশে সরাসরি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত পকেটে জমা হয়েছে।
বৈমানিকদের আইপ্যাড ও মোটরসাইকেলে তেল চুরি
ফ্লাইট চলাকালীন ডিজিটাল ফ্লাইট চার্ট, আবহাওয়া ম্যাপ ও জরুরি নেভিগেশন ম্যানুয়াল দেখতে পাইলটদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল উচ্চমূল্যের আধুনিক অ্যাপল আইপ্যাড ও ট্যাবলেট পিসি। বিমানবন্দরের ভেতরে জরুরি অপারেশনাল যোগাযোগের জন্য গ্রাউন্ড স্টাফদের দেওয়া হয়েছিল অফিশিয়াল মোটরসাইকেল ও পরিবহন। কিন্তু নিয়মিত অডিটে দেখা যায়, এসব অফিসিয়াল গ্যাজেট ও যানবাহন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সরকারি এই গাড়িগুলোর বিপরীতে অতিরিক্ত ভুয়া জ্বালানি বিল দেখিয়ে প্রতি মাসে নিয়মিত লোপাট করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থ।
তদন্তের কাঠগড়ায় নতুন চার চক্র
সাম্প্রতিক অডিট প্রতিবেদনের সূত্রে বিমানের যে চারটি নির্দিষ্ট উইং ও সেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সরাসরি সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়েছে:
১. এভিয়েশন এনডিটি অ্যান্ড কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স উইং
২. ইন-ফ্লাইট ক্যাটারিং গ্যালি প্রকিউরমেন্ট টিম
৩. ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড ককপিট ডেটা মনিটরিং সেল
৪. ওভারসিজ ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড অ্যাপ্রোন সাপোর্ট শাখা
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানে আর্থিক অনিয়ম বা কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্য নতুন নয়; কিন্তু ফ্লাইট সেফটির মূল ভিত্তি এনডিটি ও ব্ল্যাক বক্সের মতো স্পর্শকাতর প্রযুক্তিগত খাতকে কাগুজে নথিতে রূপান্তর করা স্রেফ আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং এটি পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত ও গণনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে চরম অপরাধ। অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আইনি বিচারের মুখোমুখি করার দাবি উঠেছে।
মন্তব্য করুন