বিশেষ অনুসন্ধান : পর্ব ২২
বিশেষ প্রতিবেদক: আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে ছিল, ক্ষমতার বলয়ে থেকে তারাই জড়িয়েছেন লাগামহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহারে। পদমর্যাদাকে ঢাল বানিয়ে নিজ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে তুলেছেন জ্ঞাত আয়বহির্ভূত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পাহাড়। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি, কমিশনার ও এসপি পদমর্যাদার প্রভাবশালী সাবেক পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট আইনি সংস্থাগুলো।
অনুসন্ধানের মুখে পড়া এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নানা অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জনের তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও আইনি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের মুখে থাকা শীর্ষ ৫ কর্মকর্তা
১. এস এম আক্তারুজ্জামান (সাবেক ডিআইজি):
পুলিশের এই সাবেক উপ-মহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন এই বিপুল সম্পদের উৎস খুঁজতে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
২. মো. আব্দুল বাতেন (সাবেক কমিশনার, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ):
রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার থাকাকালীন পদমর্যাদার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের জোরালো অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত আখের গোছানোর ঘটনায় বর্তমানে তিনি আইনি তদন্তের মুখোমুখি।
৩. মো. শাহ আবিদ হোসেন (সাবেক ডিআইজি):
দায়িত্বে থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন এই সাবেক ডিআইজি। দৃশ্যমান আয়ের সঙ্গে তার সম্পদের ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়ায় আইনি অনুসন্ধানের জালে পড়েছেন তিনি।
৪. সুদীপ কুমার চক্রবর্তী (সাবেক এসপি, বগুড়া):
বগুড়ার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি নানা অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলো তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখছে।
৫. মারুফ হোসেন সরদার (সাবেক এসপি):
চাকরিকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পত্তি গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে সাবেক এসপি মারুফ হোসেন সরদারের বিরুদ্ধে। দুদকের বিশেষ নজরদারিতে থাকা এই কর্মকর্তার অবৈধ আয়ের উৎস ও সম্পদের ফিরিস্তি উন্মোচনে কাজ চলছে।
চলমান আইনি পদক্ষেপ ও অনুসন্ধান
দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মকর্তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব চেয়ে নোটিশ প্রদান, ব্যাংক হিসাব তলব এবং স্থাবর সম্পত্তির নথিপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে। বেনামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন এবং পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের খতিয়ানও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা মিললেই এসব প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা ও সম্পদ জব্দের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনের রক্ষক হয়েও যারা ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, তাদের যথাযথ বিচারের আওতায় আনা না গেলে পুলিশ প্রশাসনে সুশাসন ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
মন্তব্য করুন