বিশেষ অনুসন্ধান : পর্ব ১০
বিশেষ প্রতিবেদক: ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি থানার তদন্ত কর্মকর্তা বা ‘আইও’ (ইনভেস্টিগেটিং অফিসার)। এই দায়িত্ব মূলত সামলান সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবে তৃণমূল পর্যায়ে আইনি প্রতিকার চাইতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হরহামেশাই মুখোমুখি হচ্ছেন এক সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের। মামলার ডায়েরি খোলা থেকে শুরু করে চার্জশিট জমা, এমনকি সরকারি চাকরির ভেরিফিকেশন—প্রতিটি স্তরেই গড়ে উঠেছে অর্থ আদায়ের নানা ফাঁদ।
রাষ্ট্র দেয় বরাদ্দ, খরচ মেটায় বাদী
আইন অনুযায়ী ফৌজদারি মামলার তদন্তের যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রের বহন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যপট উল্টো। তদন্তে নামার আগেই বাদীর ঘাড়ে চাপানো হয় কৃত্রিম খরচের বোঝা। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেট্রোল খরচ, যাতায়াত ভাতা, আলামত সংগ্রহ এমনকি আসামি ধরতে যাওয়ার নামেও বাদীর কাছ থেকে সরাসরি টাকা দাবি করা হয়। দাবি মেটাতে না পারলে তদন্তের গতি থমকে যায়।
ফাইনাল রিপোর্ট ও চার্জশিট নিয়ে দরকষাকষি
নির্দিষ্ট মেয়াদে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) বা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন আটকে রাখার মূল উদ্দেশ্য থাকে উভয় পক্ষকে আর্থিক চাপে রাখা। কার পাল্লা ভারী—তা দেখে প্রতিবেদন প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে ভুক্তভোগীদের।
সিজার লিস্টে ‘নয়ছয়’ ও লাইসেন্স জালিয়াতি
অভিযানের পর জব্দ তালিকা (সিজার লিস্ট) তৈরি নিয়েও বিস্তর অনিয়মের নজির মিলছে। অপরাধী বা ডাকাত দলের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার কিংবা বিদেশি মুদ্রার একটি বড় অংশ মূল তালিকায় না দেখিয়ে গোপন করার অভিযোগ পুরনো।
অন্যদিকে, বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন কিংবা ভেরিফিকেশনের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর ক্ষেত্রেও ফাঁদ পাতা হয়। প্রতিবেদনে ‘নেতিবাচক মন্তব্য’ জুড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অস্ত্র মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
আসামির খাবারের বাজেট তছরুপ, চিকিৎসায় অবহেলা
থানা হাজতে আটক আসামিদের সরকারি খরচে নির্ধারিত মানসম্পন্ন খাবার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাস্তবে দেওয়া হয় অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার; বরাদ্দের বড় অংশই চলে যায় নানা পকেটে।
হাজতে থাকা কোনো আসামির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রেও শুরু হয় দরদাম। দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার শর্তে আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
নারী নির্যাতন মামলায় অনাকাঙ্ক্ষিত মধ্যস্থতা
আদালত বা ট্রাইব্যুনাল থেকে সরাসরি তদন্তের জন্য থানায় পাঠানো মামলাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় দীর্ঘসূত্রতা। এজাহার নথিভুক্ত না করে বা প্রাথমিক তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করায় অনেক সময় বিবাদী পক্ষ পালিয়ে যাওয়া কিংবা বাদীকে ভয়ভীতি দেখানোর সুযোগ পায়।
তাছাড়া ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে থানার ভেতরেই তথাকথিত ‘কাউন্সেলিং’ বা আপসের নামে অন্যায্য সমঝোতা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক ক্লিয়ারেন্স ও ভেরিফিকেশন ফাঁদ
সরকারি চাকরি, উচ্চশিক্ষা বা বিদেশি বৃত্তির জন্য পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) রাজনৈতিক ছাড়পত্র জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারী বা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের অতীত রাজনৈতিক পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হয়রানি করা হয়। ছাড়পত্রে নেতিবাচক তথ্যের ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় অর্থ।
উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের দুই সুপারিশ
তৃণমূল পুলিশের এ অচলাবস্থা কাটাতে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা দুটি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন:
১. তদন্ত ও আইন-শৃঙ্খলা শাখা পৃথকীকরণ: আসামি ধরা বা পরোয়ানা তামিলের দায়িত্ব এবং মামলার মূল তদন্তের কাজ দুটি আলাদা ইউনিটের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। এতে কাজের চাপ কমবে এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে।
২. জব্দ তালিকায় ডিজিটাল নজরদারি: যেকোনো অভিযান ও মালামাল জব্দের সময় তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ বা লাইভ ভিডিও রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করা। ডিজিটাল প্রমাণ ছাড়া কোনো জব্দ তালিকা গ্রহণযোগ্য না হলে সম্পদে নয়ছয়ের পথ বন্ধ হবে।
মন্তব্য করুন