নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দৌড়ঝাঁপ, হয়রানি ও নানা জটিলতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি এ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের ফেসবুক পোস্টটি এনপিবি পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো……. সুপারিশ দৌড়ঝাঁপ, তবুও ড্রাইভিং লাইসেন্স মেলেনি সিনিয়র সহকারী সচিবেরসুপারিশ দৌড়ঝাঁপ, তবুও ড্রাইভিং লাইসেন্স মেলেনি সিনিয়র সহকারী সচিবেরসুপারিশ দৌড়ঝাঁপ, তবুও ড্রাইভিং লাইসেন্স মেলেনি সিনিয়র সহকারী সচিবেরএকটা ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছয় মাসের দৌড়ঝাঁপ এবং সিস্টেম নামের এক গোলকধাঁধা’বরিশালে এসিল্যান্ড থাকাকালে মাঝেমধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কিংবা বাবুগঞ্জ এবং সদর উপজেলার বর্ডারের দিকে সড়ক পরিবহন আইনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতাম। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির বাস থামিয়ে কাগজপত্র যাচাই করতাম।
একটি খুবই স্বনামধন্য পরিবহন কোম্পানির গাড়ি প্রায়ই পেতাম, যাদের কোনো না কোনো কাগজে সমস্যা থাকত। কোনো গাড়ির ফিটনেস সনদের মেয়াদ নেই, কোনো ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই, কখনো রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ শেষ।
একদিন কৌতূহলবশত মোবাইল কোর্ট চলাকালীন ওই প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এত বড় কোম্পানি, আপনারা কাগজপত্র ঠিক রাখেন না কেন?’ তিনি যে উত্তর দিয়েছিলেন, তখন পুরোপুরি বুঝিনি।বলেছিলেন, ‘স্যার, সব কাগজ ঠিক করতে বিআরটিএতে যে পরিমাণ ঘোরাঘুরি, হয়রানি আর খরচ করতে হয়, তার চেয়ে মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্টে জরিমানা দেওয়া অনেক সহজ।’ তখন কথাটা অদ্ভুত লেগেছিল।আজ এত বছর পর এসে সেই কথার মর্ম আমি হাড়ে হাড়ে বুঝছি। অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পর আরেকটি বিষয় দেখে অবাক হয়েছিলাম।
কয়েকজন বাংলাদেশিকে দেখেছি নীলক্ষেত থেকে বানানো ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করতে। একজনকে বলেছিলাম, “এটা করেন কেন? ধরা পড়লে তো নিজের পাশাপাশি দেশেরও বদনাম হবে।” তার উত্তর ছিল, “ভাই, বৈধভাবে পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। না পেরে শেষে এই পথে এসেছি।” তখনও মনে হয়েছিল, চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই বৈধ পথে সমাধান করা যায়। এবার আসি নিজের গল্পে।অস্ট্রেলিয়ায় আমার স্ত্রীর বাংলাদেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে যায়।দেশে এসে ২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করি। একইসাথে চেয়ারম্যান স্যার বরাবর আবেদন করলাম। সঙ্গে দিলাম পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। খুব দ্রুতই ই-লাইসেন্স হাতে পেলাম। কিন্তু আমাদের দরকার ছিল হার্ড কপি।
শুরু হলো তদবির। আমি নিজে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার এ কর্মরত আছি। চাকরির প্রায় আট বছরে বিআরটিএর অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছি।ঢাকা ডিসি অফিসের ম্যাজিস্ট্রেট, পরিচিত বিআরটিএ কর্মকর্তা, বিআরটিএতে কর্মরত ব্যাচমেট ম্যাজিস্ট্রেট, যাকে পেরেছি অনুরোধ করেছি।প্রায় প্রতিদিনই খোঁজ নিয়েছি। তারপর একজন ব্যাচমেটের সহায়তায় বিআরটিএর একজন ইন্সপেক্টর জরুরি ভিত্তিতে কার্ডটি প্রিন্টের জন্য পাঠালেন।
ভাবলাম, এবার শেষ। কিন্তু আসল গল্প তখনও শুরু হয়নি। আগস্টের দিকে কার্ড হাতে পেলাম। দেখি, বাবার নামের জায়গায় স্বামীর নাম চলে এসেছে। এমন কার্ড বিদেশে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। আবার সেই ইন্সপেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি বললেন, বিষয়টি তার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। হেড অফিসের এডি (লাইসেন্স) জনাব আতিকুল ইসলামের নম্বর দিলেন।প্রথম দিন ফোন করতেই তিনি ধরলেন। সব খুলে বললাম। তিনি বললেন, “দেখছি।” তারপর বহুবার ফোন করেছি। আর ফোন ধরেননি। মেসেজ দিয়েছি। উত্তর পাইনি।
আবার ইন্সপেক্টরের দ্বারস্থ হলাম। তাকে অনেক অনুরোধ করলাম। প্রথমে জানালেন লাইসেন্স অমিল অনুমোদনের আবেদন করতে। করলাম। কয়েকদিন পর অনুমোদন ও হলো। এবার কারেকশন এর আবেদন করতে বললো। সেটা করতে গেলে দেখি সব ঠিক। কোথাও ভুল নেই। আবার তাকে জানালাম।
দুই দিন পর তিনি জানালেন, “বায়োমেট্রিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বায়োমেট্রিক দিতে হবে।” বললাম, “আমার স্ত্রী তো অস্ট্রেলিয়ায়। সে এখন বাংলাদেশে এসে বায়োমেট্রিক দেবে কীভাবে?” উত্তর, এডি লাইসেন্স আতিক সাহেব সমাধান করতে পারবেন। আপনি সেখানে যোগাযোগ করেন। তাকে নক দিলে রেসপন্স করে না।
এর মধ্যে আমি বদলি হয়ে ঢাকায় চলে এসেছি। বাবা তখন আইসিইউতে। আইসিইউর সামনে বসে বসেও বিআরটিএর ওয়েবসাইট ঘাঁটছি, পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কি না। ওয়েবসাইট আপডেট করা হয় না অনেকদিন। ওয়েবসাইট এ যে সব ম্যাজিস্ট্রেটদের নাম আছে, তাদের মোটামুটি সবাই বেশিরভাগই ইউএনও হিসেবে কর্মরত। কেউ বিআরটিএ তে নেই।
সার্ভিসের একজন সিনিয়র স্যারের নাম পেলাম। স্যারকে সাথে সাথেই মেসেঞ্জারে নক দিলাম। স্যার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সাড়া দিলেন। মোবাইল নম্বর দিলেন। সব ডকুমেন্ট পাঠালাম।স্যার তার পিএকে দায়িত্ব দিলেন। পিএ দুই দিন চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত জানালেন, “বায়োমেট্রিক ছাড়া উপায় নেই।” এর কিছুদিনের মধ্যেই বাবা মারা গেলেন। বাড়ি চলে গেলাম। ঢাকায় ফিরে একদিন সরাসরি বিআরটিএ অফিসে গেলাম।
ডিডি অ্যাডমিন স্যারকে না পেয়ে ডিরেক্টর অ্যাডমিন স্যারের সঙ্গে দেখা করলাম। সব শুনে স্যার সঙ্গে সঙ্গেই ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ারকে ফোন করে বিষয়টি সমাধান করতে বললেন। ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার মহোদয় ও অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সাড়া দিলেন।
তিনি সিস্টেম অ্যানালিস্ট এবং এডি লাইসেন্সকে বিষয়টি দেখে সমাধান করতে বললেন। সিস্টেম অ্যানালিস্ট মহসিন সাহেব ও ডিডি লাইসেন্স ইব্রাহিম সাহেব প্রথমে ডুপ্লিকেট লাইসেন্স থেকে মুচকি হাসলেন। এরপর মহসিন সাহেব আতিক সাহেবকে বললেন, “এটা তো খুবই সহজ। প্রিন্ট দেওয়ার আগে সিস্টেমে এডিট অপশনে গিয়ে বাবার নাম ঠিক করে দিলেই হবে।” বললেন চলে যান। প্রিন্ট করে ফোন দিবো।আমি স্বস্তি নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। ভাবলাম, ছয় মাসের গল্প এবার শেষ। দুই দিন পর আবার ফোন করলাম।জানানো হলো, “সমাধান হয়নি। এডিট করা সম্ভব নয়। আবার বায়োমেট্রিক দিতে হবে।” আবার উবার নিয়ে বিআরটিএ।
ডিডি অ্যাডমিন স্যার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “সমাধান কী?” যে জায়গায় আমাকে বলা হয়েছিল, বায়োমেট্রিক ছাড়া কোনো সমাধান নেই, সেখানে এবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে বলা হলো, চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করলে এবং চেয়ারম্যান অনুমোদন দিলে কাজ করা সম্ভব। আমি সঙ্গে সঙ্গে chatGPT দিয়ে এক মিনিটেই আবেদন লিখে স্যারকে দিলাম। এরপর নিজ হাতে চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে নিয়ে গেলাম। স্বাক্ষর করিয়ে আবার সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিলাম।
আতিক সাহেব আমাকে চলে যেতে বললেন। আমি যাইনি। বললাম, “আমার জরুরি দরকার। আমি নিজেই ফাইল হাতে হাতে নিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে আনি।” তাই করলাম।
এক টেবিল থেকে আরেক টেবিল। এক রুম থেকে আরেক রুম। আবার নোট। আবার অনুমোদন।আবার চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে। পথে ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার মহোদয়ের সঙ্গে দেখা।
তিনি অবাক হয়ে বললেন, “আপনার কাজ এখনো হয়নি? আমি তো অনেক আগেই বলে দিয়েছি!” আবার আমার সামনেই সংশ্লিষ্টদের বলে দিলেন। জানালেন বৃহস্পতিবার অবশ্যই পাবেন। বলে দিয়েছি।আমি আশ্বস্ত হলাম। বৃহস্পতিবার গেল। রবিবার গেল।কার্ড এলো না। সোমবার আবার খোঁজ। উত্তর, “সময় লাগবে।” হন্তদন্ত হয়ে আবার বিআরটিএ অফিস গেলাম।আবার এক কর্মকর্তা থেকে আরেক কর্মকর্তা। ডিডি এডমিন স্যার অনেক চেষ্টা করলেন সমাধানের। এরপর আমাকে ডিরেক্টর অপারেশন স্যারের কাছে রেফার করলেন। স্যারও চেষ্টা করলো।
শেষ পর্যন্ত জানানো হলো, সমস্যা সমাধানের জন্য সিএনএসকে ই-মেইল করা হয়েছে। তারা সিস্টেমে সমস্যা সমাধান করে লাইসেন্স শাখায় পাঠাবে, তারপর প্রিন্ট হবে।
অথচ এই প্রক্রিয়ার শুরুতেই সিএনএস এর সিস্টেম এনালিস্ট মহসিন সাহেব বলেছিলেন, “সিস্টেমে এডিট করলেই হয়ে যাবে।”যাই হোক। মরার আগে কোনো একদিন হয়তো লাইসেন্সটা পাব, এই আশায় একবুক হতাশা নিয়ে বিআরটিএ অফিস থেকে বের হলাম।ফেরার পথে হঠাৎ নীলক্ষেতে গেলাম। কৌতূহলবশত একটি দোকানে জিজ্ঞেস করলাম, “ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড প্রিন্ট করা যায়?”
উত্তর, “এক হাজার টাকা দিলেই করে দেব। শুধু চিপের অংশটা হবে না।” আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।কারণ হঠাৎ কয়েক বছর আগের সেই পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তার কথা মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়ল অস্ট্রেলিয়ায় দেখা সেই বাংলাদেশির কথা, যে বলেছিল, “বৈধ পথে চেষ্টা করে না পেয়ে অবৈধ পথে গেছি।”
আমি বাংলাদেশ সরকারের ক্যাডার সার্ভিসে প্রায় আট বছর চাকরি করেছি। এই আট বছরে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছি।তারপরও পরিচিত কর্মকর্তা, ব্যাচমেট, ইন্সপেক্টর, সিনিয়র কর্মকর্তা, ডিরেক্টর, সিস্টেম অ্যানালিস্ট এবং চেয়ারম্যানের অনুমোদন সবকিছুর পরেও ছয় মাসে একটি ভুল তথ্য সংশোধন করে ডুপ্লিকেট ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে পাইনি।
এখন আমার প্রশ্ন খুব সাধারণ। আমার যদি এই অবস্থা হয়, যার বিআরটিএতে একজন পরিচিত মানুষও নেই, তার কী অবস্থা?আমি পরিচয় দিয়েও সেবা পাইনি। পরিচয় না দিলে কী হয়, আল্লাহই ভালো জানেন। যেখানে বৈধ কাজ করতে গিয়ে একজন নাগরিককে এতগুলো দরজা, এতগুলো ফোন, এতগুলো সুপারিশ আর এতগুলো অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যে, একসময় অবৈধ শর্টকাটটাই তার কাছে সহজ মনে হতে শুরু করে। আর সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
আতিকুল সাহেবের রুমে বসে ডিডি লাইসেন্স ইব্রাহিম সাহেব এবং সিস্টেম এনালিস্ট বলতেছিল ” মিনিমাম ৩০ হাজার টাকা লাগে এই প্রিন্ট করতে। এই প্রিন্ট আমাদের রেগুলার সিস্টেম এর না। সামনের সাইড একটা সিস্টেম এ এবং পিছনের সাইড আরেকটা সিস্টেম এ”। প্রিন্টটাও বায়োমেট্রিক বাইপাস করে করা। তার মানে তারা চাইলে কোনো কিছুই লাগে না। না চাইলে দুনিয়ার যত ঘুরাঘুরি সব করাবে, হাইকোর্ট দেখাবে।মাসুদরা কখনও ভালো হয় না। তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে সরকারি অফিসে চাকরি করে। তাদের বিচার আল্লাহ ছাড়া কেউ করতে পারবে না।
মন্তব্য করুন