সরকারি নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তহশিলদার মরিয়ম বেগমের বেপরোয়া সিন্ডিকেট; তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস এসিল্যান্ডের
ময়মনসিংহ বিশেষ প্রতিনিধি: ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস এখন সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। সরকারি সেবা যেখানে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, সেখানে এই কার্যালয়ে চলছে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য, ফাইল জিম্মি ও সীমাহীন হয়রানি। বিশেষ করে জমির নামজারি (মিউটেশন), ডিসিআর সংগ্রহ ও খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রতি ফাইলে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) মরিয়ম বেগমের বিরুদ্ধে।
সরকারি ফি ১,১৭০, দাবি ৮-১০ হাজার ভূমি মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ই-নামজারির সরকারি নির্ধারিত ফি মোট ১ হাজার ১৭০ টাকা। অথচ চর ঈশ্বরদিয়া ভূমি অফিসে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে নামজারির আবেদন পৌঁছালেই শুরু হয় দরকষাকষি। চাহিদামতো মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে ফাইলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল ধরা, শুনানিতে অযথা সময়ক্ষেপণ কিংবা সরাসরি আবেদন বাতিল করার মতো ভয়ভীতি দেখানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “সব বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়েও মাসের পর মাস টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়। তহশিলদার মরিয়ম বেগম স্পষ্ট জানিয়ে দেন—’খরচ’ ছাড়া ফাইলে সই পড়বে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই ঋণ করে কিংবা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ করাতে বাধ্য হচ্ছেন।”
সক্রিয় মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ও রাজস্ব ফাঁকি
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরাসরি লেনদেনের ঝুঁকি এড়াতে তহশিলদার মরিয়ম বেগম স্থানীয় একটি মধ্যস্বত্বভোগী দালাল চক্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। নির্ধারিত টাকার ভাগ পৌঁছালে মুহূর্তেই জটিল ফাইলের নিষ্পত্তি ঘটে, আর টাকা না দিলে সাধারণ মানুষের ফাইল ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। এই অবৈধ আর্থিক লেনদেনের কারণে সরকার একদিকে বিপুল অঙ্কের প্রকৃত রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ঘোষিত স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ভূমি সেবার পুরো ধারণাই চর ঈশ্বরদিয়ায় এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন
অভিযোগের পাহাড় সামনে রেখে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মরিয়ম বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ সাজানো, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সরকারি নিয়ম মেনেই সব কার্যক্রম চলছে। কোনো অবৈধ লেনদেনের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
প্রশাসনের কড়া বার্তা
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দা তামান্না হোরায়রা বলেন, “ভূমি সেবায় সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ লেনদেন বা সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করার কোনো সুযোগ নেই। নামজারির নির্ধারিত ফি ছাড়া বাড়তি টাকা দাবি করা স্পষ্টতই অনিয়ম। চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মরিয়ম বেগমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে বিধি মোতাবেক কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ক্ষোভ ও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
এলাকার সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের আখড়ায় পরিণত করা চরম অপরাধ। দুর্নীতির এই বলয় না ভাঙলে সাধারণ প্রান্তিক কৃষকদের জমি রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়বে। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর জোর দাবি—অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে চর ঈশ্বরদিয়া ভূমি অফিসের সব নথিপত্র খতিয়ে দেখতে হবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন