ময়মনসিংহ প্রতিনিধি | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ময়মনসিংহে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও রাজনীতির আড়ালে গড়ে ওঠা এক দুর্ধর্ষ অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল হোতা স্বপ্না সরকারের অপরাধনামা সম্প্রতি নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। লোকসঙ্গীত ও বাউল শিল্পীর আবরণে ঢাকা এই নেত্রীর মাফিয়া নেটওয়ার্ক ও তাঁর পরিচালিত বহুমাত্রিক অপরাধের বিস্তারিত চিত্র উন্মোচিত হয়েছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
জিলা স্কুল মোড়ের ডাকাতি ও ডিবি পুলিশের হাতে ধরা পড়া:
ময়মনসিংহের অপরাধ জগতে স্বপ্না সরকারের সরাসরি জড়িত থাকার সবচেয়ে বড় ও সাম্প্রতিক প্রমাণ পাওয়া গেছে নগরীর জিলা স্কুল মোড়ের ঐতিহ্যবাহী ‘চাচারের হোটেল’-এর মালিকের বাসভবনে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায়। একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র চক্র নিয়ে স্বপ্না সরকার উক্ত বাসভবনে হানা দিয়ে নগদ ২২ লক্ষ টাকা এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ডাকাতি করেন। ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দ্রুত তদন্তে নামে। ডিবির সুনির্দিষ্ট অভিযানে স্বপ্না সরকার আটক হন এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করে লুণ্ঠিত অর্থের একটি অংশ ফেরত দিতে বাধ্য হন। এই ঘটনার মাধ্যমে তাঁর শিল্পী ও রাজনৈতিক পরিচয়ের পেছনের আসল ‘মাফিয়া’ রূপ লোকচক্ষুর সামনে উন্মোচিত হয়।
ডিপজলের চলচ্চিত্র অনুপ্রাণিত মাফিয়া নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ বছর ধরে বাউল ও লোকসঙ্গীত পরিবেশনের ছদ্মবেশটি মূলত তাঁর অন্ধকার জগৎকে আড়াল করার একটি নিপুন কৌশল হিসেবে কাজ করেছে। বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় খল-অভিনেতা ডিপজলের অভিনীত দাপুটে চরিত্রগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বপ্না সরকার নিজের এই সিন্ডিকেট ও ভয়ংকর সাম্রাজ্য তৈরি করেন। চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত ভয়ভীতি প্রদর্শন, ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং নারী ও মাদকের সিন্ডিকেট পরিচালনার কৌশল বাস্তবে রূপ দিয়ে তিনি ময়মনসিংহে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন।
রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ছদ্মবেশে পূর্বের অপরাধের খতিয়ান
স্বপ্না সরকারের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক গুরুতর অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে, যেগুলো তিনি রাজনৈতিক পদবি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ব্যবহার করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এসেছেন:
* ব্ল্যাকমেইলিং ও ভিডিও পর্নোগ্রাফি: দলীয় বা সামাজিক কর্মসূচির অজুহাতে তরুণী ও অন্যান্য নেত্রীদের নিজ বাসভবনে ডেকে এনে জিম্মি করা, জোরপূর্বক আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ করা এবং পরবর্তীতে তা প্রকাশের হুমকি দিয়ে বিপুল অর্থ ও সোনা হাতিয়ে নেওয়া।
* সংঘবদ্ধ নারী ব্যবসা ও মাদক সিন্ডিকেট: রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় সুসংগঠিত দেহব্যবস্থা ও নারীপাচার চক্র পরিচালনা করা। একই সাথে শেরপুরের নকলা নিবাসী মেহেদীর মতো চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সাথে যৌথভাবে হেরোইন ও ইয়াবার মতো মারাত্মক মাদকের নেটওয়ার্ক চালানো।
* জমি দখল ও চাঁদাবাজি: স্থানীয় প্রভাবশালী মহলকে সাথে নিয়ে সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি ও জমি দখলের পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়।
‘স্বপ্না খন্দকার’ নামগত বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের অপকৌশল
অনুসন্ধানী পর্যালোচনায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, নিজের অপরাধ ঢাকা এবং প্রশাসনিক নজরদারি থেকে বাঁচতে স্বপ্না সরকার দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বপ্না খন্দকার’ নামটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে এসেছেন। অনলাইনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বপ্না খন্দকারের নামে যেসকল ব্ল্যাকমেইলিং ও অপরাধের খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার সিংহভাগ ছবি ও মূল নেপথ্য চরিত্র ছিল স্বপ্না সরকারের। অপেশাদার বা হলুদ সাংবাদিকদের টাকা দিয়ে তথ্য বিকৃত করে এবং সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করে তিনি মূল জনরোষ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে প্রথম সারির মূলধারার জাতীয় গণমাধ্যমে খন্দকারের নামে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য না থাকা এবং সম্প্রতি জিলা স্কুল মোড়ের ডাকাতি মামলায় স্বপ্না সরকার সরাসরি গ্রেপ্তার হওয়ায় এই বিপরীত বিভ্রান্তির সত্যতা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বিচারিক দাবি ও প্রশাসনিক সংস্কার
জিলা স্কুল মোড়ের চাচারের হোটেলের মালিকের বাসায় ডাকাতি এবং বিগত ১৭ বছরের অপরাধের খতিয়ান বিবেচনায় নিয়ে ময়মনসিংহের সচেতন যুবসমাজ ও নাগরিকবৃন্দ স্বপ্না সরকারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন:
* ডাকাতি ও সাইবার অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার: ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’-এর অধীনে ডাকাতি এবং ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন’ ও ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’-এর আওতায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।
* অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: বিগত ১৭ বছরে ব্ল্যাকমেইলিং, মাদক ব্যবসা, স্বর্ণ ও নগদ টাকা ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থমূল্য, গাড়ি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দুদক ও আদালতের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করা।
* প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা: অপরাধী যে-ই হোক, রাজনৈতিক পদবি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে সকল সহযোগী ও আশ্রয়দাতাদের আইনের মুখোমুখি করা।
মন্তব্য করুন