admin 1
৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

এক উপজেলায় প্রায় ১৩ বছর: এনামুল হকের দীর্ঘ কর্মকাল ঘিরে নানা প্রশ্ন

বিশেষ  প্রতিনিধি: সরকারি নথি অনুযায়ী, এনামুল হক ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হিসেবে যোগ দেন। এরপর প্রায় এক দশক ধরে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্তও ঘাটাইলে কর্মরত ছিলেন তিনি। মাঝের সময়টুকু বাদ দিলে একই উপজেলায় তাঁর মোট কর্মকাল দাঁড়ায় প্রায় ১৩ বছর।

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, বরাদ্দ আত্মসাৎ, নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখানো, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তিন বছর পর বদলি, আবারও ঘাটাইলে: প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ৭ আগস্ট কালিহাতী থেকে বদলি হয়ে ১৬ আগস্ট ঘাটাইলে যোগ দেন এনামুল হক। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গোপালপুরে বদলি করা হয়। পরে বগুড়ায় বদলির নির্দেশ হলেও সেটি স্থগিত হয়। এরপর ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনি আবার ঘাটাইলে ফিরে আসেন।

সেই থেকে টানা প্রায় এক দশক ধরে একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সরকারি ওয়েবপোর্টালেও বর্তমানে তাঁকেই পিআইও হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে তাঁর যোগদানের তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০১৬ উল্লেখ রয়েছে।এত দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে একজন বদলিযোগ্য কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন প্রশাসনিকভাবে কীভাবে সম্ভব হয়েছে—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

প্রকল্পে কাজ নেই, কাগজে বরাদ্দ?

এনামুল হকের বিরুদ্ধে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে। টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও কর্মসৃজন কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করেই কাগজে কাজ দেখানো, অস্তিত্বহীন প্রকল্পে বরাদ্দ এবং একই স্থানে একাধিকবার প্রকল্প দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কাবিখা প্রকল্পে ২৩৯ দশমিক ৮৫৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ না করেই সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে অন্তত ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথাও উল্লেখ ছিল।

তবে সে সময় এনামুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, প্রকল্পগুলোর কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।এরপর ২০২৫ সালের আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে কাবিখার সরকারি বরাদ্দ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। সেখানে অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে এনামুল হকের নাম উল্লেখ করা হয়।

কর্মসৃজন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ: ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকদের কাজ না করিয়ে তাঁদের নামে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। এমনকি শ্রমিকদের বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে থাকার অভিযোগও উঠে আসে।

প্রতিবেদনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে পিআইও এনামুল হককে প্রকল্পের অনিয়মের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া হলেও তিনি নির্দিষ্ট বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তে সরকারি অর্থ ফেরতের তথ্য: এনামুল হককে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০১৭ ও ২০১৯ সালের প্রকাশিত অভিযোগের পর টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, তদন্তে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। পরে পিআইওসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে ১ কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪০০ টাকা ফেরত নেওয়া হয়। একই প্রতিবেদনে দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎপরতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে তদন্তের পূর্ণাঙ্গ নথি, দায় নির্ধারণ এবং অর্থ ফেরতের আইনি ভিত্তি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে এসব তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

সম্পদ অর্জন নিয়েও প্রশ্ন: এনামুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি থেকে পাওয়া আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের প্রধান সড়কে খাদ্যগুদামের বিপরীতে দোকানঘরসহ জমি কেনার অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে জমির বিক্রেতার বক্তব্যও প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে এনামুল হক দাবি করেছেন, ওই সম্পত্তির অর্থের সঙ্গে অন্য একটি লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি ওই দোকান থেকে ভাড়া পান।অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে হলে সম্পত্তির দলিল, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

পাহাড়ি মাটি কাটার সিন্ডিকেটের অভিযোগ: সরকারি প্রকল্পের বাইরে ঘাটাইলের পাহাড়ি লাল মাটি কাটা ও বিক্রির একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গেও এনামুল হকের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার ও বেকু দিয়ে পাহাড়ি মাটি কেটে বিক্রির যে চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়, তার সঙ্গে পিআইওর প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও প্রভাব খাটিয়ে মাটি কাটার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এ ছাড়া উপজেলা কৃষি অফিস, ঘাটাইল খাদ্যগুদাম ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে কথিত ঘুষ লেনদেনের একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গেও তাঁর যোগসাজশ রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে।তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

এত বছর একই কর্মস্থলে কেন?

সব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে—একজন বদলিযোগ্য কর্মকর্তা কীভাবে এত দীর্ঘ সময় একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন? ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস-২০২৫-এর ৭(ক) ধারার উল্লেখ করে বদলিযোগ্য কর্মকর্তার একই স্থানে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে এনামুল হকের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও ব্যাখ্যা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।কারণ কোনো কর্মকর্তাকে বদলি, পদায়ন কিংবা একই কর্মস্থলে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক এখতিয়ারের বিষয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই এলাকায় দায়িত্ব পালনের ফলে জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাঁর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এতে সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা জরুরি।এ জন্য এনামুল হকের দীর্ঘ কর্মকাল, প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি, বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব, মাস্টাররোল, বিল-ভাউচার, প্রকল্প পরিদর্শন প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং তাঁর আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।কারণ সরকারি অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ নয়, প্রমাণ; প্রচার নয়, স্বচ্ছ তদন্ত; এবং প্রভাব নয়, জবাবদিহি।

মন্তব্য করুন

[wpdevart_facebook_comment curent_url="https://deshreport24.com/archives/7154" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান ১ দিনের রিমান্ডে

১

শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

২

এন্টি টেররিজম ইউনিটের নতুন পরিচয় ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’

৩

ডেল্টা লাইফের পৌনে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতি: আইন উপদেষ্টা ঝালকাঠী’র মোঃ মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

৪

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন

৫

চিরিংগা হাইওয়ে ওসির বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও টোকেন বাণিজ্য: প্রতিবাদে শ্রমিকদের মানববন্ধন, দম্ভোক্তি ‘উর্ধ্বতনদের টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করি’

৬

ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল: আকুয়া ভূমি অফিসে হাশেমের রাজত্ব, জিম্মি সেবাগ্রহীতারা!

৭

‘খুব শিগগিরই’ শেষ হতে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প

৮

মাথার ওপর ঝুলছে মরিচা ধরা রড, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা: চরম মৃত্যুঝুঁকিতে নকলা থানার পুলিশ সদস্যরা

৯

ময়মনসিংহে ট্রাফিক বিভাগের প্রসিকিউশন মুন্সি কনস্টেবল ফারুকের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও চালকদের চরম হয়রানির অভিযোগ

১০

জীবনের হিসাব থেকে মুছে যাওয়া গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাড়ে ১৭টি বছর

১১

ঘুষে পোস্টিং ও জ্বালানি কেলেঙ্কারির অভিযোগে হাইওয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর মাহবুবুল

১২

রাড্ডায় হামলা-লুটপাট, ওসি প্রত্যাহার

১৩

ঈশ্বরগঞ্জে অনলাইন জুয়ার অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

১৪

জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক, আ.লীগের শতাধিক নেতাকর্মী আটক

১৫

ফ্যাসিবাদের দোসরদের গ্রেপ্তার করলে পুলিশকে পুরস্কৃত করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

পাহাড়ে অধিকারবঞ্চনার বহুমাত্রিক ফাঁদ: পরিবহন থেকে পানি সবখানেই আদিবাসীদের বাদ রাখার প্রশাসনিক কৌশল

১৭

ক্রসফায়ার ও জুলাই গণহত্যার রূপকার এডিসি জাহাঙ্গীর ও এসি মাসুম: একজন পালালেও অন্যজন বহাল তবিয়তে

১৮

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে সংঘর্ষে নিহত ২

১৯

হবিগঞ্জে মাদকসহ তিনজন আটক

২০