বিশেষ প্রতিনিধি: কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ, রাজস্ব ফাঁকি, ভুয়া দাতা দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদ, নকল নবিস মো. ফারুক ও মেহেদী হাসান রুমেলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী, দলিল লেখক ও স্থানীয়রা। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না। সেবা নিতে আসা হুমায়ুন কবির বলেন, “এই অফিস ভবনের ইটেও টাকা চায়। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এখানে ফেরেশতা আসলেও টাকা দিতে হবে।”
স্থানীয় সূত্র ও দলিল লেখকদের অভিযোগ, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে মোটা অঙ্কের “টেবিল মানি” না দিলে ফাইল নিষ্পত্তি করা হয় না। নকল নবিস ফারুক ও মেহেদী হাসানের মাধ্যমে কাজ না করলে সাধারণ গ্রাহকদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক অভিযোগ করেন, কমিশনভিত্তিক দলিল নিবন্ধনের নামে দাতার বাড়িতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে দলিল নিবন্ধন না করে ফিরে আসার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া দাতা দেখিয়ে দলিল নিবন্ধনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নকল নবিস মেহেদী হাসান রুমেল অতীতে নিজেকে ঢাকা জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় নিবন্ধিত দলিলের তথ্য পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভুয়া দাতা সাজিয়ে জাল দলিল তৈরি, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি এবং পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আড়াকুল মৌজার একটি বায়নানামা দলিল পরে ঘুষের বিনিময়ে পরিবর্তন করে কম মূল্যে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে একই সম্পত্তির সাফ কবলা দলিলে মূল গ্রহীতার পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নামে দলিল নিবন্ধন করা হয়, যার ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
আরেক ঘটনায় বেয়ারা মৌজার একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল ভুয়া নামজারি ও খাজনার কাগজপত্রের ভিত্তিতে নিবন্ধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ কাজে সাব-রেজিস্ট্রার পাঁচ লাখ টাকা এবং অফিস খরচের নামে আরও এক লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করা হয়।
মো. শাকিল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বাঘৈর মৌজার দুটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই বাতিল করা হয়েছে। এ জন্য সাব-রেজিস্ট্রার ১০ লাখ টাকা এবং নকল নবিসরা আরও দুই লাখ টাকা নিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তার অভিযোগ, দলিল বাতিলের আগেই সংশ্লিষ্ট জমির বিপরীতে এক কোটি ২০ লাখ টাকা হাতবায়না দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে যোগদানের পর তার জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মিরপুরে স্ত্রীর নামে বাড়ি এবং শরীয়তপুরের জাজিরায় নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে যোগদানের আগে তিনি মৌলভীবাজার সদর, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন ও সদরপুর, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, ঢাকা উত্তরার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, শ্রীমঙ্গল এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে বদলি হন এবং তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা আদালতের রায়ের আগে এগুলো প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য নয়।
মন্তব্য করুন