মো.মনিরুজ্জামান, ময়মনসিংহ ব্যুরো: ময়মনসিংহ নগরী ও এর আশপাশের এলাকায় ইদানীং সাধারণ মানুষের মাঝে এক নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘গ্যাস লিকেজ’। আবাসিক ভবনের জরাজীর্ণ পাইপলাইন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক এলাকা বা কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার (১০ জুলাই) নগরের ৬ নং ওয়ার্ডের সেনবাড়ি এলাকায় গ্যাস লিকেজের ভয়াবহ আশংকা দেখা দেয়। পরে স্থানীয় রায়হান রহমান মুন্না নামের এক ব্যক্তি ৯৯৯ কল করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহন করেন।এক পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিস ও তিতাস গ্যাস অফিসের লোকজন এসে রাস্তা খনন করে লিকেজ হওয়া লাইন সংস্কার করেন। সাম্প্রতিক ভয়াবহতা গত জুন মাসের শেষভাগে ময়মনসিংহ নগরীর গোলপুকুর পাড় এলাকায় একটি ওয়ার্কশপে পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার কাটার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ও গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। কোনো অগ্নিকান্ড না ঘটলেও সিলিন্ডার থেকে বের হওয়া বিষাক্ত ও তীব্র গ্যাসের গন্ধে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা ও বমিভাব নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে ৩৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা ভর্তি হন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় আইসিইউতে নিতে হয়েছিল। এর আগেও জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন এবং ভালুকা ও ত্রিশালের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সিলিন্ডার ও রাইজার লিকেজ থেকে অগ্নিকান্ড ও প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেছে, যা নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে রাখছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক এলাকার অনেক গ্যাস সরবরাহ লাইন ও রাইজার অত্যন্ত পুরোনো ও মরিচা ধরা। এগুলো নিয়মিত সংস্কার বা তদারকি করা হয় না। নগরীর বেশ কিছু এলাকায় নিয়মনীতি অমান্য করে এবং নিম্নমানের পাইপ ও ফিটিংস ব্যবহার করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়া হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার। বাজারে এবং বিভিন্ন ভাঙারির দোকানে থাকা পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারগুলো কোনো সুরক্ষানীতি না মেনে কাটার সময় বড় ধরনের লিকেজ বা বিস্ফোরণ ঘটছে।
ভূক্তভোগী সাজ্জাত হোসেন বলেন,গতকাল মনিরের বিল্ডিং এর দেয়াল ভেঙে আমার ঘরের উপরে পরেছে আল্লাহর রহমতে কোন রকম বেঁচে আছি। সে অপরিকল্পিত ভাবে ভবন নির্মান করেছে আমি এর সঠিক বিচার চাই। আজ এ ভবন মালিকের জন্য এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্ধা মো. বুলবুল হোসেন বলেন, আমরা সবসময় ঝুঁকির মধ্যে দিন পাড় করছি। এই ভবন মালিক অনুমতি ছাড়াই এখান ভবন করেছে। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নেয় নি। ভবন করার সময় ড্রেন বন্ধ করে ফেলছে। এখন এই ড্রেন দিয়ে ঠিকমত পানিও যায় না। গতকাল বিল্ডিং এর দেয়াল বাতিজার বাড়ির উপরে পড়েছে সেই জন্যই গ্যাসের লাইন লিকেজ হয়েছে আমি চাই লাইনগুলো চেক করা হোক। আর নিয়মবহির্ভূত কোন বিল্ডিং যেন অনুমতি না দেওয়া হয়।
রায়হান রহমান মুন্না বলেন, আমরা রাতে বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় গ্যাসের গন্ধ পাই। পরে সবাই এসে দেখি গ্যাসের লাইন লিকেজ হয়েছে। পরে ট্রিপল নাইনে কল দেই, ফায়ার সার্ভিসকে কল দেই। ফায়ার সার্ভিস অফিস বলে আগুন লাগলে পরে আসবো। পরে এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন প্রশাসককে জানানো হলে সে তৎক্ষনাৎ ব্যবস্থা গ্রহন করে। এখন কাজ চলমান রয়েছে।এ ঘটনায় অভিযুক্ত বিল্ডিং মালিক মনিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফুনটি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ময়মনসিংহের জরুরি বিভাগের দ্বায়িত্বে থাকা সুপার ভাইজার সাইফুর রহমান বলেন, রাতে তিনটার দিকে আমার কাছে একটা কল যায় গ্যাস লাইন লিকেজ হয়েছে। আমি দ্রæত ঘটনাস্থলে এসে দেখি লাইনের অবস্থা খুব খারাপ। পরে আমাদের ইমার্জেন্সি টিমকে কল করি তারা দ্রæত চলে আসে। এখন কাজ চলছে আল্লাহর রহমতে বড় ধরনের দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেল এই এলাকার লোকজন। মূলত পাশের বিল্ডিং ধসে পড়ায় এই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক রুকনুজ্জামান সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন,খুব দ্রæত কাজ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, ময়মনসিংহে গ্যাস লিকেজের এই নিত্যদিনের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ গ্যাস লাইনের বিরুদ্ধে দ্রæত চিরুনি অভিযান চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে যত্রতত্র নিয়ম না মেনে পুরোনো সিলিন্ডার কাটার মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন