নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় একটি অনলাইন মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে আর্থিক প্রতারণা, কর্মী শোষণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ‘চ্যানেল ই’ (সাবেক একান্ত টিভি) নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের টার্গেট করে আসছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের আড়ালে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাংবাদিক, এডিটর, ক্যামেরাপার্সন ও টেকনিক্যাল কর্মীদের যুক্ত করা হয়। তাদের দিয়ে লোগো, এনিমেশন, স্টুডিও ডিজাইন, আইডি কার্ড এবং পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার সেটআপের কাজ করিয়ে নেওয়া হলেও পরিশোধ করা হয় না চুক্তি অনুযায়ী পাওনা অর্থ।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: একাধিক অভিযোগে উঠে এসেছে, একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন চ্যানেল সেটআপের কাজ বাবদ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর পরিশোধ করা হয় মাত্র ৪ হাজার টাকা, তাও যাতায়াত ভাড়া হিসেবে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে বহু মানুষকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের বেতন আত্মসাতের অভিযোগ: অভিযোগ রয়েছে, অন্য গণমাধ্যম থেকে বেশি বেতন ও ভালো সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের ‘চ্যানেল ই’-তে যুক্ত করা হয়। পরে মাসের পর মাস বেতন আটকে রাখা হয়। একজন গণমাধ্যমকর্মী, নূর আফরিন পপির অভিযোগ অনুযায়ী, তিন মাসের বেতন আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত অর্থ খরচ করে করা রিপোর্টিংয়ের যাতায়াত ব্যয়ও ফেরত দেওয়া হয়নি। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা মানেই আর্থিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং প্রতারণার ঝুঁকি।
হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগ: অভিযোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি। একাধিক অভিযোগকারীর ভাষ্য, পাওনা টাকা চাইলে শুরু হয় চাপ, ভয় দেখানো এবং হুমকি। একজন ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, ২৪ ফেব্রুয়ারি বকেয়া বেতন চাইলে তাকে প্রকাশ্যে গাড়ি দিয়ে পিষে ফেলার এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
নাম পরিবর্তনের পেছনের প্রশ্ন: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ‘চ্যানেল ই’ পূর্বে ‘একান্ত টিভি’ নামে পরিচালিত হতো। অভিযোগ রয়েছে, একটি মূলধারার টেলিভিশনের নাম ও লোগোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ব্র্যান্ডিং ব্যবহার করায় বিতর্কের মুখে নাম পরিবর্তন করা হয়। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে নাম বদল কি শুধুই ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য, নাকি বিতর্ক এড়ানোর কৌশল?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগ: অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, হানিট্র্যাপসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া কিছু ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এখনো সম্পন্ন হয়নি।
নিবন্ধন ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন:
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে কার্যক্রম চললেও প্রতিষ্ঠানটির বৈধ সরকারি নিবন্ধন, লাইসেন্স ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সচেতন মহল বলছে, যদি একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র না থাকে, তাহলে সেটি আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য:
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
‘চ্যানেল ই’-এর মালিক হিসেবে পরিচিত শেখ রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
প্রতিষ্ঠানটির আরেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আরিফকে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে নেহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন:
এ বিষয়ে আমার কোনো কথা নেই। সব রাসেল ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করুন। আমি কিছু জানি না।
উপসংহার: অভিযোগগুলো গুরুতর এবং বহুমাত্রিক। আর্থিক প্রতারণা, কর্মী শোষণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অনৈতিক কার্যক্রম সব মিলিয়ে ‘চ্যানেল ই’কে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর বিতর্ক।
তবে সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং তদন্ত সংস্থার নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সচেতন মহল মনে করছে যদি অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মন্তব্য করুন