চট্টগ্রাম অফিস: চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ মৌজায় ভয়ংকর অনিয়ম, সরকারি জায়গা দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রহস্যজনকভাবে বহুতল ভবনের অনুমোদন পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ চলাচলের রাস্তা না থাকা সত্ত্বেও সরকারি জায়গার উপর অবৈধ কালভার্ট নির্মাণ করে সেটিকে প্রবেশ সড়ক হিসেবে ব্যবহার করে ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির ইতোমধ্যে ১১ তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। অথচ অনুমোদিত নকশা, বৈধ সংযোগ সড়ক, কাঠামোগত অনুমোদন এবং নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ মৌজার আর.এস দাগ নং- ৬৩৪৫ (অংশ), ৬৩৭৪ (অংশ), ৬৩৭৫ (অংশ), ৬৩৭৬ (অংশ), ৬৩৭৭ (অংশ), ৬৩৮৭ (অংশ), ৬৬৮৮ (অংশ), ৬৬৮৯ (অংশ), ৬৬৯০ (অংশ), ৬৬৯১ (অংশ) এবং বি.এস দাগ নং- ১২১০৭ (অংশ), ১২১০৮ (অংশ), ১২১০৯ (অংশ), ১২৩০৭ (অংশ), ১২৩০৮ (অংশ), ১২৪১৬ (অংশ), ১৪৩৬ (অংশ) এর জমিতে ২০ তলা ও ৩টি বেইসমেন্ট বিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদনের আবেদন করা হয়।
পরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর ইমারত নির্মাণ কমিটি ৩০ জুলাই ২০২৩ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে সাইট পরিদর্শন করে অনুমোদন ছাড়াই পাইলিংসহ নির্মাণকাজ চলমান দেখতে পায়। তখন কাজ বন্ধ রাখা এবং কাঠামোগত নকশা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশ অমান্য করেই নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে— ভবনটির জন্য কোনো বৈধ চলাচলের রাস্তা নেই বলে স্থানীয়দের দাবি। তারপরও সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত বিভাগের সংলগ্ন প্রায় ৪০ ফুট সরকারি জায়গা ব্যবহার করে অবৈধভাবে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই কালভার্টই বর্তমানে ভবনের প্রবেশ সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গণপূর্ত বিভাগের এক দায়িত্বশীল প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“এ ধরনের কোনো অনুমতির বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে অনুমতির কথা বললেও লিখিত কোনো অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন “যেখানে চলাচলের রাস্তার জায়গাই নেই, সেখানে কিভাবে একটি ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবনের প্লান অনুমোদন পায়?” এ ঘটনায় সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট ইন্সপেক্টর জাফরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার প্রতিবেদনে অসঙ্গতি রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় ঘুষ ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বৈধ এক্সেস রোড ছাড়া কোনো বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া সরকারি জায়গা দখল করে কালভার্ট নির্মাণ বা সেটিকে সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, সিটি করপোরেশন আইন এবং সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং জড়িত সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সরকারি জমি উদ্ধারের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ, সরকারি জায়গা উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে নগর পরিকল্পনা ও আইনের শাসন নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হবে।স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য—“কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে এত বড় অনিয়ম চললেও ব্যবস্থা না নেওয়া রহস্যজনক। এর পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে কিনা, সেটিও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন