admin 1
১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:২১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মেডিকেল শিক্ষায় মান নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশে অ্যাক্রেডিটেশনের প্রভাব এবং একটি প্রতিষ্ঠানের করুণ পরিণতি

জাহিদ হাসান: ময়মনসিংহের উইনারপাড়ে অবস্থিত ইটের লাল দালানগুলো একসময় গর্বের প্রতীক ছিল। ১৯৯৫ সালে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রয়াত অধ্যাপক এ.আই.এম. মফাকখারুল ইসলাম যখন ‘কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ’ (সিবিএমসিবি) প্রতিষ্ঠা করেন, তখন লক্ষ্য ছিল একটাই—তৃণমূল মানুষের জন্য মানবিক ডাক্তার তৈরি করা। কিন্তু তিন দশক পর, সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে আছে এক ধ্বংসস্তূপের ওপর, যার নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসনিক অযোগ্যতা, দুর্নীতি এবং নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা। এই প্রতিবেদনের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রিন্সিপাল, অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান খান চৌধুরী। অভিযোগ উঠেছে, তার ‘মেরুদণ্ডহীন’ নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতাই এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

প্রশাসনিক স্থবিরতা: নেতৃত্ব যখন ‘নপুংসক’

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রিন্সিপাল হলেন সেই জাহাজের কাপ্তান, যার হাতে থাকে দিকনির্ণয়ের ভার। কিন্তু সিবিএমসিবি-এর বর্তমান চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রশাসনিক পরিভাষায় যাকে ‘Ineffective Leadership’ বলা হয়, ভেতরের ভুক্তভোগীরা তাকেই অভিহিত করছেন ‘নপুংসক প্রশাসন’ হিসেবে।

বর্তমান প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ—তিনি প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কেবল একটি আলঙ্কারিক পদে বসে আছেন, যেখানে অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করাই তার প্রধান কাজ। একজন প্রিন্সিপাল যদি ‘ঠিক থাকতেন’, অর্থাৎ তার প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং নৈতিক অবস্থান যদি দৃঢ় হতো, তবে প্রতিষ্ঠানের এই অরাজকতা কখনোই শিকড় গাড়তে পারত না। তার এই দুর্বলতার সুযোগেই ভেতরে গড়ে উঠেছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা শিক্ষা কার্যক্রমকে জিম্মি করে রেখেছে।

অযোগ্যতার অনুপ্রবেশ: ভর্তি বাণিজ্য ও প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি

একটি মেডিকেল কলেজের গুণগত মানের প্রথম ধাপ হলো মেধাবী ছাত্র নির্বাচন। কিন্তু সিবিএমসিবি-এর বর্তমান প্রশাসনের অধীনে এই পবিত্র প্রক্রিয়াটি কলুষিত হয়েছে। সিআইডি-এর (CID) সাম্প্রতিক মেডিকেল প্রশ্নফাঁস তদন্তে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য—প্রশ্নফাঁস চক্রের অন্যতম হোতা ইমরুল কায়েস ছিলেন এই কলেজেরই ছাত্র।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ‘প্যাটার্ন’। প্রিন্সিপালের নাকের ডগাতেই বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নফাঁস বা অর্থের বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী বা ‘অশিক্ষিত’ ছাত্রদের ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে এমন সব ছাত্রকে ডাক্তার হওয়ার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, যাদের প্রাথমিক বিজ্ঞান বোঝার মতো মেধার ঘাটতি রয়েছে। প্রশাসন যদি শুরুতেই এই আগাছাগুলোকে আটকাতে পারত, তবে আজ শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু প্রিন্সিপালের প্রশ্রয়েই এই ‘বিষবৃক্ষ’ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

পরীক্ষার প্রহসন: সিন্ডিকেট এবং ‘মিনার’ রহস্য

ছাত্র ভর্তির পর আসে তাদের মান যাচাই বা পরীক্ষার পালা। কিন্তু সিবিএমসিবি-তে পরীক্ষার হলগুলো এখন নকল আর দুর্নীতির অভয়ারণ্য। বিশ্বস্ত সূত্রের অভিযোগ, পরীক্ষার কমিটিতে (Examination Committee) একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে। এই প্রসঙ্গে বারবার উঠে এসেছে ‘মিনার’ নামের একজন প্রভাবশালী কনভেনারের ইঙ্গিত।

এই সিন্ডিকেটের কাজ হলো—টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বা পরীক্ষার হলে অনৈতিক সুবিধা প্রদান করা। যারা অযোগ্য বা ‘অশিক্ষিত’ হয়ে মেডিকেলে ঢুকেছে, তারা পাস করার জন্য স্বাভাবিকভাবেই অনৈতিক পথের খুঁজবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের থামানোর দায়িত্ব ছিল প্রিন্সিপালের। তিনি যদি পরীক্ষার হলে সিসি ক্যামেরা মনিটরিং বা কঠোর ইনভিজিলেশন নিশ্চিত করতেন, তবে এই অসাধুতা বন্ধ হতো। অথচ, তিনি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের কার্যক্রমকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিয়েছেন। ফলে, সিবিএমসিবি থেকে এখন যারা পাস করে বের হচ্ছে, তাদের সার্টিফিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বাতি নেভার শঙ্কা (WFME/ECFMG Crisis)

সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি অপেক্ষা করছে অদূর ভবিষ্যতে। ২০২৪ সাল (পরবর্তীতে ২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত) থেকে আমেরিকার ECFMG (Educational Commission for Foreign Medical Graduates) নতুন নিয়ম কার্যকর করছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ডাক্তার যদি আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা বা প্র্যাকটিস করতে চান, তবে তার মেডিকেল কলেজটিকে অবশ্যই WFME (World Federation for Medical Education) স্বীকৃত হতে হবে।

বাংলাদেশে এই স্বীকৃতির দায়িত্বে থাকা BMEAC (Bangladesh Medical Education Accreditation Council) নিজেই এখনও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে ধুঁকছে। এর মধ্যে সিবিএমসিবি-এর অবস্থা আরও করুণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (Quality Assurance Scheme) বজায় রাখার জন্য ল্যাব, গবেষণা এবং কারিকুলামে যে আধুনিকায়ন প্রয়োজন, বর্তমান প্রিন্সিপাল তার কিছুই করতে পারেননি।

ফলাফল? আজ বা কাল যারা এই কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বের হবে, তাদের ডিগ্রি আন্তর্জাতিক বিশ্বে ‘কাগজের টুকরো’ ছাড়া আর কিছুই হবে না। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া তো দূরের কথা, মধ্যপ্রাচ্যেও তাদের চাকরির সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। হাজার হাজার ছাত্রের ভবিষ্যৎ আজ এই একজন ব্যক্তির অদূরদর্শিতার কারণে অন্ধকারের মুখে।

জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত: আমরা কি ডাক্তার তৈরি করছি, নাকি ঘাতক?

সবশেষে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া ডাক্তাররা দেশ ও বিশ্বকে কী দেবে?

যখন একজন ছাত্র এনাটমি বা ফিজিওলজি না বুঝেই কেবল টাকার জোরে পাস করে স্টেথিস্কোপ গলায় ঝোলায়, তখন সে রোগীর জন্য ‘সেবক’ নয়, ‘ঘাতক’ হয়ে ওঠে। ভুল ডায়াগনসিস, ভুল ওষুধ প্রয়োগ এবং চিকিৎসায় অবহেলা—এরাই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের চিত্র।

“শেষের শুরুটা এই হলো!”—এই বাক্যটি এখন সিবিএমসিবি-এর করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হয় না, ঘরের ভেতরের অযোগ্য নেতৃত্বই যথেষ্ট।

কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। এই ধ্বংসযজ্ঞের একচ্ছত্র দায়ভার বর্তমান প্রিন্সিপালের। তিনি তার প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং ছাত্রদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এখনই যদি এই ‘নপুংসক’ প্রশাসনের পরিবর্তন না হয় এবং যোগ্য নেতৃত্ব না আসে, তবে খুব শীঘ্রই এই প্রতিষ্ঠানের নাম ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আর তার দায়ভার বহন করতে হবে এই ব্যর্থ কান্ডারিকেই।

মন্তব্য করুন

[wpdevart_facebook_comment curent_url="https://deshreport24.com/archives/2743" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান ১ দিনের রিমান্ডে

১

শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

২

এন্টি টেররিজম ইউনিটের নতুন পরিচয় ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’

৩

ডেল্টা লাইফের পৌনে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতি: আইন উপদেষ্টা ঝালকাঠী’র মোঃ মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

৪

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন

৫

চিরিংগা হাইওয়ে ওসির বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও টোকেন বাণিজ্য: প্রতিবাদে শ্রমিকদের মানববন্ধন, দম্ভোক্তি ‘উর্ধ্বতনদের টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করি’

৬

ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল: আকুয়া ভূমি অফিসে হাশেমের রাজত্ব, জিম্মি সেবাগ্রহীতারা!

৭

‘খুব শিগগিরই’ শেষ হতে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প

৮

মাথার ওপর ঝুলছে মরিচা ধরা রড, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা: চরম মৃত্যুঝুঁকিতে নকলা থানার পুলিশ সদস্যরা

৯

ময়মনসিংহে ট্রাফিক বিভাগের প্রসিকিউশন মুন্সি কনস্টেবল ফারুকের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও চালকদের চরম হয়রানির অভিযোগ

১০

জীবনের হিসাব থেকে মুছে যাওয়া গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাড়ে ১৭টি বছর

১১

ঘুষে পোস্টিং ও জ্বালানি কেলেঙ্কারির অভিযোগে হাইওয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর মাহবুবুল

১২

রাড্ডায় হামলা-লুটপাট, ওসি প্রত্যাহার

১৩

ঈশ্বরগঞ্জে অনলাইন জুয়ার অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

১৪

জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক, আ.লীগের শতাধিক নেতাকর্মী আটক

১৫

ফ্যাসিবাদের দোসরদের গ্রেপ্তার করলে পুলিশকে পুরস্কৃত করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

পাহাড়ে অধিকারবঞ্চনার বহুমাত্রিক ফাঁদ: পরিবহন থেকে পানি সবখানেই আদিবাসীদের বাদ রাখার প্রশাসনিক কৌশল

১৭

ক্রসফায়ার ও জুলাই গণহত্যার রূপকার এডিসি জাহাঙ্গীর ও এসি মাসুম: একজন পালালেও অন্যজন বহাল তবিয়তে

১৮

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে সংঘর্ষে নিহত ২

১৯

হবিগঞ্জে মাদকসহ তিনজন আটক

২০