সৈয়দা তাহরিবা হোসাইন (শিক্ষানবিশ আইনজীবী)
শৈশব থেকে আমরা দেখে এসেছি, ময়মনসিংহের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেন এক মৃতপ্রায় হাতি। বছরে দু-একবার বড়জোর জেগে ওঠে, যার সুফল সাধারণ রোগীরা পায় মাত্র দু-তিন দিন। বাকি সময়টা? হাসপাতালটি ঘিরে থাকে দালালদের এক অভেদ্য চক্র। আর ভেতরে যারা ‘ডাক্তার’ নামক মহান পেশার আড়ালে বসে আছেন, তাদের অনেকেরই প্রধান এজেন্ডা–যে কোনো উপায়ে রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে বের করে প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো। এই অরাজকতার মাঝেই ময়মনসিংহের মানুষ আশা খুঁজেছিল বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায়। অনেকে ভিটেমাটি বা হালের গরু বিক্রি করে ছুটে যেতেন ‘কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ’ (সিবিএমসিবি)-এর দিকে। কিন্তু হায়! সেই আস্থার শেষ আশ্রয়স্থলটি আজ পরিণত হয়েছে এক সুসংগঠিত ‘মরণফাঁদে’।
চিকিৎসার নামে বাণিজ্য: সুস্থ মানুষকে কবরে পাঠানোর আয়োজন সম্প্রতি একটি ঘটনা ময়মনসিংহের মানুষের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ পেটের পীড়া নিয়ে আসা এক রোগীকে সিনিয়র ডাক্তারদের কারসাজিতে ‘ক্যান্সার রোগী’ সাজানো হলো। নেপথ্যে ছিল এক জঘন্য সমীকরণ— ষাটোর্ধ্ব শ্বশুরের সম্পত্তির লোভে মেয়ের জামাই এবং ডাক্তারদের এক পৈশাচিক সিন্ডিকেট। টাকার লোভে একজন সুস্থ মানুষকে ভুল কেমোথেরাপি দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। যে চিকিৎসকের কাজ জীবন বাঁচানো, তারা যখন কসাইয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় জালিয়াতি: রক্ষক যখন ভক্ষক
শুধু চিকিৎসা নয়, এই প্রতিষ্ঠানের পচন ধরেছে শিক্ষাসনের শিকড়েও। সম্প্রতি ‘দৈনিক জাহান’-এ প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে সিবিএমসিবি-র ভেতরের এক ভয়াবহ চিত্র। প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডা. নাজমা পারভীন আনসারী এবং প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী উপদেষ্টা ডা. মির্জা হামিদুল হকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার পবিত্রতাকে ধুলিসাৎ করেছে। নিজের বিদেশ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে মনগড়া রুটিনে পরীক্ষা নেওয়া, অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা খাতায় সই করার মতো জালিয়াতি এখানে ‘ওপেন সিক্রেট’।
ডা. শাহনাজ জাহান: সততার চরম মূল্য এবং ‘স্কেপগোটিং’
তবে এই দুর্নীতির চেয়েও ভয়াবহ চিত্রটি ফুটে ওঠে নিউজের কমেন্ট সেকশনে এবং ভেতরের খবরে। প্রতিষ্ঠানে যখনই কোনো সত্য ফাঁস হয়, তখন অপরাধীরা নিজেদের শুধরানোর পরিবর্তে সৎ এবং মেধাবী কাউকে বলির পাঁঠা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ডা. শাহনাজ জাহানের মতো নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকরা, যারা ডিপার্টমেন্টের মূল দায়িত্ব পালন করেন এবং নিজের মেধা দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আগলে রাখেন— আজ তারাই টার্গেট।
খবরটি বাইরে আসার পর ডা. শাহনাজকে দোষারোপ করা হচ্ছে এই বলে যে, তিনিই নাকি সাংবাদিকদের তথ্য দিয়েছেন। তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত (Traumatized) করা হচ্ছে, যা তিনি নিজেই কমেন্টে আক্ষেপ করে জানিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, তিনি এই নোংরা রাজনীতির শিকার। সততা বজায় রাখতে গিয়ে তাকে আজ কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার—সত্যকে ধামাচাপা দিতে একজন নিরপরাধকে ফাঁসিয়ে দাও, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ মুখ খোলার সাহস না পায়। একজন মেধাবী চিকিৎসক যখন সুবিধাবঞ্চিত হয়ে উল্টো মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে প্রতিষ্ঠানটির মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
নিজেই কমেন্টে আক্ষেপ করে জানিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, তিনি এই নোংরা রাজনীতির শিকার। সততা বজায় রাখতে গিয়ে তাকে আজ কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার—সত্যকে ধামাচাপা দিতে একজন নিরপরাধকে ফাঁসিয়ে দাও, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ মুখ খোলার সাহস না পায়। একজন মেধাবী চিকিৎসক যখন সুবিধাবঞ্চিত হয়ে উল্টো মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে প্রতিষ্ঠানটির মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
সাধারণ রোগীরা যাবে কোথায়?
একদিকে সরকারি হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে বেসরকারি মেডিকেলে ‘মির্জা-পলাশ’ সিন্ডিকেটের অরাজকতা। একদিকে হাসপাতালে টাকার লোভে সুস্থ মানুষের কোলন কেটে ক্যান্সার রোগী সাজিয়ে দিচ্ছে কেমো! অপর দিকে কলেজে পরীক্ষার রুটিন জালিয়াতি করা, আর সত্য প্রকাশ পেলে ডা. শাহনাজের মতো নিরপরাধ সৎ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়া—এই হলো ময়মনসিংহের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার চালচিত্র। এই শহরে ন্যায়বিচার আজ নির্বাসিত। সাধারণ রোগীরা কি তবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে, নাকি সর্বস্ব বিক্রি করে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরবে? যারা আজ ডা. শাহনাজের মতো সৎ মানুষদের কণ্ঠরোধ করছে, তারা ভুলে গেছে—প্রকৃতির বিচার বড় নির্মম। সময় এসেছে এই মাফিয়া তন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার। নতুবা, এই শহরের বাতাসে ভেসে থাকা দীর্ঘশ্বাস একদিন প্রলয় হয়ে নেমে আসবে।
মন্তব্য করুন