নিজস্ব প্রতিনিধি : কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগে ৬১ লাখ টাকার অডিট আপত্তি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অভিযোগের সঙ্গে পৌরসভার দাপ্তরিক নথির মিল নেই। প্রকৌশল বিভাগের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ-সংবলিত কোনো অডিট আপত্তির চিঠিও পৌরসভায় পাওয়া যায়নি।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার যেকোনো বিল বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরেজমিনে কাজের পরিমাণ পরিমাপ করে মেজারমেন্ট বুক (এমবি) ও বিল ফরমে লিপিবদ্ধ করেন। কাজ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন দিয়ে বিলটি সহকারী প্রকৌশলীর কাছে দাখিল করা হয়। পরে সহকারী প্রকৌশলী তা যাচাই-বাছাই করে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে উপস্থাপন করেন। নির্বাহী প্রকৌশলীর সুপারিশের ভিত্তিতে মেয়র বা প্রশাসক বিল পরিশোধ করেন।
তিনি দাবি করেন, এ প্রক্রিয়ায় কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি।রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাৎ প্রমাণিত হওয়া নয়। অডিটে কোনো আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর তার জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করে। অডিট কর্তৃপক্ষ জবাব পর্যালোচনা করে সন্তোষজনক মনে করলে আপত্তি প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করতে পারেন। জবাব সন্তোষজনক না হলে আপত্তি বহাল থাকে এবং পরবর্তী পর্যায়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়।
তিনি বলেন, উত্থাপিত অডিট আপত্তির সঙ্গে একাধিক পর্যায়ের কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তাই শুধু নির্বাহী প্রকৌশলীর নাম উল্লেখ করে তাঁকে এককভাবে দায়ী করা ভিত্তিহীন ও অবান্তর।
পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রহমান ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার অডিট অধিদপ্তর থেকে যেসব অডিট আপত্তি পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৌশল বিভাগের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ-সংবলিত কোনো অডিট আপত্তি তাঁদের দপ্তরে পাওয়া যায়নি।
পৌরসভার দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় যোগদান করেন। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের অডিট আপত্তির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা ৬৫ মিটার ড্রেন নির্মাণের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাঁদের জানা নেই। মাঠপর্যায়ে জনগণের চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে কোনো কোনো কাজের দৈর্ঘ্য বা পরিমাণে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, স্থান ও নথি ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ বিভ্রান্তিকর।
উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আজিজুল হক জুয়েল বলেন, অভিযোগে কোনো ওয়ার্ড, প্রকল্প কিংবা নির্দিষ্ট কাজের স্থান উল্লেখ করা হয়নি। চূড়ান্ত বিল প্রস্তুতের আগে সম্পাদিত কাজের পরিমাণ সরেজমিনে পরিমাপ করে মেজারমেন্ট বুকে লিপিবদ্ধ করা হয়। এরপর বিল ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংযুক্ত করা হয়। তাঁর দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই কাজ ও বিল সম্পন্ন করা হয়েছে।
উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, উল্লিখিত অডিট আপত্তি-সংক্রান্ত কোনো চিঠি পৌরসভায় পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত বিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মেয়র বা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। এরপর সরেজমিনে কাজের পরিমাণ পরিমাপ করে মেজারমেন্ট বুকে লিপিবদ্ধ ও বিল ফরমে তথ্য সংযুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, পৌরসভার দৈনন্দিন প্রয়োজন ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসক বা মেয়রের নির্দেশনা ও অনুমোদন নিয়ে বিধি মেনে ক্ষুদ্র ভাউচারের মাধ্যমে জরুরি কাজ করা হয়ে থাকে।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্মপরিধি অনুযায়ী উন্নয়নকাজে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার দায়িত্ব রয়েছে। কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত, যাচাই-বাছাই, সুপারিশ ও অনুমোদন—প্রতিটি ধাপেই পৃথক দায়িত্ব পালন করা হয়। ফলে কোনো অডিট আপত্তি থাকলে তার প্রকৃত নথি, প্রকল্প, স্থান, অর্থবছর ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট প্রকল্প, স্থান কিংবা দাপ্তরিক নথি উল্লেখ না করে অভিযোগ প্রকাশ করায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পৌরসভার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
মন্তব্য করুন