ময়মনসিংহ, ভালুকা থেকে ফিরে ,মোঃ মেহেদী হক (সুমন): আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যার কাঁধে, তার বিরুদ্ধেই উঠেছে আইনকে পুঁজি করে অবৈধ অর্থ বাণিজ্য চালানোর ভয়াবহ অভিযোগ। ময়মনসিংহের ভালুকা মহাসড়কে এখন চালকদের মুখে মুখে এক নাম টি আই পলাশ। অভিযোগ, তার ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া অনেক যানবাহনের চলাচল কার্যত অসম্ভব।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি, ট্রাকচালক, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ ঘুষ না দিলে মামলা, টাকা না দিলে গাড়ি আটক, আর দরকষাকষি করলে শুরু হয় মানসিক হয়রানি। ফলে অনেক চালকের কাছে এখন বৈধ কাগজপত্রের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাকে কত টাকা দিতে হবে। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী পণ্যবাহী ট্রাক, কুরিয়ার ভ্যান, গরুবাহী ট্রাক প্রায় সব ধরনের যানবাহন থেকেই নিয়মিত টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন এক ধরনের ওপেন সিক্রেট সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, টি আই পলাশ এর আগে ময়মনসিংহে কর্মরত ছিলেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ছিল। আরও অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহের মোজনুর নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি ভালুকায় বদলি হয়ে আসেন। আর এখানে আসার পর থেকেই তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
কোরবানির ঈদে ‘গরুর ট্রাক মানেই টাকা’: সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কোরবানির ঈদকে ঘিরে। একাধিক ট্রাকচালকের দাবি, গত ঈদে প্রতিটি গরুবাহী ট্রাক থেকে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। টাকা না দিলে ভালুকা পার হওয়া তো দূরের কথা, গরুর হাটে প্রবেশ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বগুড়া থেকে আসা এক ট্রাকচালক সত্তার (ছদ্মনাম) কণ্ঠে ছিল অসহায়তা
“স্যার, অনেক দূর থেকে গরু নিয়ে আসছি। একটু কম নেন। এত গরু নিয়ে যদি ঢুকতে না পারি, তাহলে আমরা কোথায় যাব?”
তার দাবি, অনুরোধ-নিবেদন কোনো কাজেই আসেনি।
কুরিয়ার সার্ভিসও অভিযোগের বাইরে নয়: শুধু গরুর ট্রাক নয়, কুরিয়ার খাতেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সুন্দরবন, করতোয়া, জনতা, ফাস্টট্র্যাক, পাঠাও, সওদাগরসহ বিভিন্ন কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কিছু গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ। অনেক চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ হলো, এই দুর্বলতাকেই হাতিয়ার বানিয়ে মাসিক ভিত্তিতে মোটা অঙ্কের টাকা তোলা হয়।
পরিবহন খাতের অনেকের ভাষায়
“টাকা দিলে সব ঠিক, টাকা না দিলে সব বেঠিক।”
এক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন “আইন প্রয়োগের চেয়ে টাকার হিসাবটাই যেন বড় হয়ে গেছে। বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কাগজপত্রবিহীন গাড়ি ও অনভিজ্ঞ চালকদের অবাধ চলাচল সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। প্রশ্ন উঠছে যদি আইন রক্ষাকারীরাই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর না হয়ে উল্টো সুবিধাভোগী হয়ে ওঠেন, তবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হবে কীভাবে?
বক্তব্য মেলেনি
এ বিষয়ে টি আই পলাশের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার বলেন “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই ভালুকা মহাসড়কে কি আইনের শাসন চলছে, নাকি অদৃশ্য ঘুষ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত।
মন্তব্য করুন