বিশেষ প্রতিনিধি : ঠাকুরগাঁও পৌরসভার একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে মাসের পর মাস বিটুমিন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। অভিযোগ, বারবার যোগাযোগ করেও বিটুমিন না পেয়ে চরম হয়রানির শিকার হন তারা। পরে এলজিআরডি মন্ত্রীর ফোনের পর বিশেষ ব্যবস্থায় বিটুমিন সরবরাহ করা হলেও ঘটনাটি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে যমুনা অয়েলের সরবরাহব্যবস্থা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে। ঘটনার জেরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (জেওসিএল) মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করেছে। একই সঙ্গে গত এক বছরে বিটুমিন সরবরাহে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিপিসির প্রশিক্ষণ, সাবসিডিয়ারি প্রশাসন ও কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জারি করা এক তাগিদপত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত চিঠিটি যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়।পরে নির্দেশনা অনুযায়ী মো. মাসুদুল ইসলামকে এমডির দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।তাগিদপত্রে বলা হয়, মো. আবদুস সামাদ নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির দাখিল করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গত বছরের ৭ ডিসেম্বর যমুনা অয়েলে বিটুমিন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পে-অর্ডার জমা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিটুমিন বরাদ্দ পায়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ এলাকার এবং গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিটুমিনের অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছিল। এ বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করেও বিটুমিন কমিটির কাছ থেকে কোনো কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি।অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৩ মে যমুনা অয়েলের এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে ৫ মে বিটুমিন সংগ্রহের আশায় ঠাকুরগাঁও থেকে চট্টগ্রামে যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে আসেন অভিযোগকারী প্রতিনিধি। সেখানে সারাদিন অপেক্ষা করার পর তাঁকে জানানো হয়, তাঁর সিরিয়াল নম্বর ৯৫ এবং ওই মুহূর্তে বিটুমিন দেওয়া সম্ভব নয়।
এ ঘটনায় মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।পরে উপায়ান্তর না পেয়ে বিষয়টি এলজিআরডি মন্ত্রীর নজরে আনা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এরপরও বিটুমিন সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মো. আবদুস সামাদ বলেন, ‘পে-অর্ডার জমা দেওয়ার ছয় মাস পার হলেও আমরা বিটুমিন পাইনি। অথচ সাধারণত এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই বিটুমিন পাওয়ার কথা।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিটুমিন সরবরাহের ক্ষেত্রে তাঁদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। ‘একেক সময় একেক সিরিয়াল নম্বর বলা হয়েছে। কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা একাধিকবার যোগাযোগ করলেও বিটুমিন দেওয়া হয়নি,’ বলেন তিনি।মো. আবদুস সামাদ আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও বিটুমিন না পাওয়ায় আমরা পে-অর্ডার ফেরত চাই। কিন্তু সেটিও ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে বিষয়টি এলজিআরডি মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করা হয়।’তবে ভিন্ন কথা বলছেন অভিযুক্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এ ধরনের অভিযোগের মতো কোনো কাজ করিনি। পুরো বিটুমিন সরবরাহ প্রক্রিয়াটি অনলাইনভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও সিরিয়াল পরিবর্তন বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, অভিযোগকারী যে ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন চেয়েছিলেন, সে সময় ইস্টার্ন রিফাইনারি শাটডাউনে থাকায় ওই গ্রেডের কোনো উৎপাদন ছিল না। ফলে তা সরবরাহের সুযোগও ছিল না। ‘রিফাইনারিতে খোঁজ নিলেই বিষয়টি জানা যাবে,’ বলেন তিনি।মো. মাসুদুল ইসলাম জানান, অভিযোগকারীর প্রকল্পের জন্য মূলত স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল) থেকে বিটুমিন সরবরাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি যমুনা অয়েলে আবেদন করেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মতো জমা না দেওয়ায় তাঁর সিরিয়াল পিছিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘অভিযোগকারীর আবেদনপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি টাইম এক্সটেনশন নিয়ে এপ্রিল মাসে কাগজপত্র জমা দেন। এরপরও সব ডকুমেন্ট ঠিকভাবে এন্ট্রি না হওয়ায় তাঁর সিরিয়াল আরও পিছিয়ে যায়। এটি অনলাইনের নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে।’চট্টগ্রামে আসতে অভিযোগকারীকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলেননি বলেও দাবি করেন এই কর্মকর্তা। তার দাবি, ‘আমাদের আইটি বিভাগের একজন সদস্য তাঁকে ডেকেছিলেন বিষয়টি বুঝিয়ে বলার জন্য। কেন তাঁর সিরিয়াল পিছিয়েছে, সেটি দেখানোর জন্য তাকে আসতে বলা হয়েছিল।’
মন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর বিশেষ বিবেচনায় নিয়ম শিথিল করে অভিযোগকারীকে বিটুমিন সরবরাহ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন মো. মাসুদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় ফোন করার পর আমরা বিশেষ ব্যবস্থায় ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে পুরোনো বিটুমিন গলিয়ে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন সরবরাহ করেছি। যদিও তাঁর আবেদন ছিল ৮০-১০০ গ্রেডের জন্য।’মাসুদুল ইসলাম বলেন, ‘এক গ্রেডের পরিবর্তে অন্য গ্রেডের বিটুমিন সরবরাহ করাও নিয়মের বাইরে। তারপরও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটি করা হয়েছে।’নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় বা অনিয়ম করিনি। সরকার ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই কাজ করেছি। হয়তো আমাকে এখান থেকে সরানোর জন্য একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি আল্লাহর ওপর বিচার ছেড়ে দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় গ্রাহকদের মূল্যায়ন করি। কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে পারে। আমি ২২ দিন রুটিন দায়িত্বে এমডির দায়িত্বও পালন করেছি। এমডি হওয়ার চেষ্টা করেছি, হয়তো সেটিই আমার অপরাধ।’এ বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। বিপিসির তাগিদপত্র পাওয়ার পর মো. মাসুদুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।’
মন্তব্য করুন