চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: Gmail হ্যাক করে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো. ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানায়, গত ৭ এপ্রিল বিকেলে সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা এলাকার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন তার দোকানে থাকা অবস্থায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ফোন চালু হলে তিনি দেখতে পান, তার ব্যবহৃত বিকাশ, নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকিং অ্যাপস মোবাইল থেকে উধাও হয়ে গেছে।
এরই মধ্যে তার ইউসিবি ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাব থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বিকাশ-নগদ নম্বরে স্থানান্তর হয়ে যায়। বিষয়টি টের পেয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, তিনি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্রের শিকার হয়েছেন।
এ ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় মামলা দায়ের হলে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, ডিজিটাল বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো. ইকবালসহ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করা হয়। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চক্রটির প্রধান মো. ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন, ১৮টি বিকাশ নিবন্ধিত সিম, আটটি ব্যাংক চেক বই, তিনটি ব্যাংক কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের Gmail ও অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করত। এরপর ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অর্থ স্থানান্তর করত। আত্মসাৎ করা অর্থ একাধিক স্তরে স্থানান্তরের মাধ্যমে আড়াল করে পরে অনলাইন জুয়া, গরু ব্যবসা এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা হতো।
পুলিশের তথ্যমতে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। চক্রের প্রধান ইকবালের বিরুদ্ধে ফেনী ও নোয়াখালী জেলায় একই ধরনের অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে। সহযোগী রুবেলের বিরুদ্ধেও প্রতারণার মামলা রয়েছে। চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, প্রতারকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও সিম সংগ্রহ করে অবৈধ লেনদেনে ব্যবহার করত। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ ক্যাশ-আউট করে নানা ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হতো।
এদিকে সাইবার প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে নাগরিকদের Gmail, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যাংকিং ও MFS অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী ও পৃথক পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু রাখা, OTP ও পাসওয়ার্ড গোপন রাখা এবং অপরিচিত লিংক বা রিমোট অ্যাক্সেস অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহক নিরাপত্তা জোরদারে ফেস ভেরিফিকেশন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথেনটিকেশন ও ডিভাইস ভেরিফিকেশনসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কোনো সাইবার অপরাধ বা অনলাইন প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। জনসচেতনতাই ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ।
মন্তব্য করুন