মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওয়াকফকৃত সম্পত্তি নিয়ে বরাবরই দেশজুড়ে নানা অনিয়মের খবর আসে। এবার সেই তালিকায় নাম উঠল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাথুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সাহামত আলী জামে মসজিদের। দেড় যুগের পুরনো এই মসজিদের নামে ওয়াকফ করা ৪৩ শতক জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে সেখানে চলছে গাছ কাটা-বিক্রি, জমির মাটি কেটে বিক্রি, পুকুর খন করে মাছ চাষ-বিক্রি পর্যন্ত। এমনকি ওয়াকফ সম্পত্তির রেকর্ড বদল করে নিজেদের নামে পাকাপোক্ত করার পাঁয়তারা চলছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের সারমর্ম
মসজিদের আম-মোতাওয়াল্লি মোঃ এরশাদ মিয়া বাদী হয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ওয়াকফ প্রশাসকের বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, মৌজা বাথুয়া, জেএল নং-১০, বি.এস খতিয়ান নং-৭৩০ এর আওতাধীন দাগ নং-৪৩১, ৪৭, ৭৫, ৪১৯, ৫, ৮ বাটে মোট ৪৩ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের নামে ওয়াকফকৃত। ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যই এই জমি দান করা হয়েছিল। কিন্তু বিবাদী মোঃ হামিদ, তার ছেলে মোঃ শহীদসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭/৮ জন ব্যক্তি প্রায় ১৩ বছর ধরে এই জমি দখলে রেখেছেন। দখলের পর তারা যা করছেন—গাছপালা লুট, জমিতে থাকা পুরাতন মূল্যবান গাছপালা কেটে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন।মাটি কাটা, মসজিদের ২৪০ গন্ডা চাষের জমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ইটভাটা ও অন্যান্য জায়গায় বিক্রি করেছেন। ফলে কৃষিজমি এখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পুকুর খন ও মাছ বিক্রি, চাষের জমি কেটে বড় আকারের পুকুর খন করে মৎস্য চাষ করছেন এবং নিয়মিত মাছ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছেন। রেকর্ড জালিয়াতি, মসজিদের জায়গা অন্যত্র রেকর্ড ও রেওয়াজ বদল করে নিজেদের দখল বৈধ করার চেষ্টা করছেন।
হুমকি আর হয়রানির মুখে মসজিদ কমিটি, অভিযোগে আরও বলা হয়, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করলে বিবাদীরা বাদী এরশাদ মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার চেষ্টাও চলছে বলে দাবি করা হয়। ফলে মসজিদের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ওয়াকফ এস্টেট আইন, ২০০৪ লঙ্ঘন করে জমি ব্যবহার করায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি নিজের সম্পত্তির উপরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
বিবাদী শহীদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত শহীদের বিরুদ্ধে এলাকায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। আপন চাচার ঘর-বাড়ি কুপিয়ে টিন-বেড়া নষ্ট করা, আপন চাচীর গায়ে হাত তোলার ঘটনায় আদালতে মামলাও চলমান। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। একই কায়দায় এবার মসজিদের সম্পত্তির উপর ‘কুনজর’ দিয়ে বাণিজ্য শুরু করেছেন তিনি।
মোতাওয়াল্লির আকুতি: প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার নেই
মসজিদের মোতাওয়াল্লি এরশাদ মিয়া বলেন, “এই জমি আমাদের বাপ-দাদারা মসজিদের নামে দান করে গেছেন। এখন দেখি তারা দিনের পর দিন গাছ কাটে, মাটি বিক্রি করে, পুকুর কাটে। আমরা বাধা দিতে গেলে মারে, হুমকি দেয়। ১৩ বছর ধরে প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন দিতেও এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
প্রশাসন যা বলছে
এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযোগটি তারা গ্রহণ করেছেন। সরেজমিন তদন্ত করে সত্যতা যাচাই শেষে ওয়াকফ এস্টেট আইন ও ভূমি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি।
আইন বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
আইনজীবীরা বলছেন, ওয়াকফ সম্পত্তি আল্লাহর নামে উৎসর্গকৃত। এটি বিক্রি, হস্তান্তর বা ব্যক্তিগত ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওয়াকফ এস্টেট আইন, ২০০৪ অনুযায়ী অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তদন্ত ও বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণেই দখলদাররা বছরের পর বছর পার পেয়ে যায়।
তফসিল:
মৌজা- বাথুয়া, থানা- পটিয়া, জেলা- চট্টগ্রাম জেএল নং- ১০, বি.এস খতিয়ান- ৭৩০ দাগ নং- ৪৩১, ৪৭, ৭৫, ৪১৯, ৫, ৮ বাটে মোট ৪৩ শতক জমি। এখন এলাকাবাসীর একটাই দাবি— দ্রুত তদন্ত করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পুকুর খন বন্ধ এবং ওয়াকফ সম্পত্তি মসজিদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দিক প্রশাসন। অন্যথায় এমন দৃষ্টান্ত আরও দখলদারকে উৎসাহিত করবে।
মন্তব্য করুন