নিজস্ব প্রতিবেদক : নরসিংদী শহরের মাদরাসাতুল আবরার এরাবিয়া মাদরাসায় ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে গোসল না করায় নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক নাজমুস সাকিব এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকের প্রহারে শিশুটির পিঠে রক্ত জমাট হয়ে যায়। পুরো পিঠ জুড়ে কালো কালো বেত্রঘাতের দাগ পরে যায়। শিশুটির অবস্থা সংকটাপর্ন হয়ে পড়লে তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিষটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়লে শনিবার বিকেলে নরসিংদীর ভেলানগর জেলখানার মোড়ে অবস্থিত মাদরাসাতুল আবরার এরাবিয়া মাদ্রারাসার শিক্ষক নাজমুস সাকিবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আহত শিশুর নাম মুজাহিদ। সে শিবপুর উপজেলার দক্ষিন কারারচর এলাকার দর্জি জুয়েল আহমেদ ও শান্তা বেগমের ছেলে। সে মাদরাসাটির নাজেরা বিভাগে পড়াশোনা করেন। শুক্রবার অভিযুক্ত শিক্ষক নাজমুস তাকে গোসল করতে বলেন। এতে অনীহা প্রকাশ করা তথা কথা না শুনায় মাদরাসার শিক্ষক নাজমুস তাকে বেত দিয়ে বেধরক পিটায়। এতে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরার পর ওই মাদরাসা শিক্ষক তাকে পুনরায় পিটায়। একপর্যায়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের গভীর চিহ্ন পড়ে যায় । এবং সারা শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়া ফেটে রক্ত বের হতে থাকে।
ওই সময় শিশুটি একাধিক বার মাফ চাইলেও তাকে মাফ করেননি পাষন্ড শিক্ষক। পরে বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এদিকে শিশুটির বাবা শিশুটিকে দেখতে মাদরাসায় যায়। ওই সময় তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পায়। পরে জামা খুলে পরিবারের সদস্যরা শিশুটির শরীরজুড়ে বেতের দাগ ও রক্তাক্ত ক্ষত দেখতে পান। এ ঘটনায় তারা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে শিশু মুজাহিদকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়ি যাওয়ার পর তার অবস্থার আরো অবনতি হয়।
রাত ২টার দিকে তীব্র জ্বর বমি সহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। পরে পরিবারের সদস্যরা পুনরায় তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। বিষয়টি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক মিমাংসা করে অভিযুক্ত শিক্ষককে জরিমানা ও অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই মধ্যে শিশুটির অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে শনিবার বিকেলে শিশুর পরিবারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ তাকে আটক করেন।
শিশু মুজাহিদ বলেন, আমি গোসল করি নাই দেখে হুজুর আমাকে মারছে। আমাকে মারার পর আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি। তার পর আবার ওঠার পর আবার মারছে। আমি বার বার বলছি আমাকে মাফ করে দেন তবুও আমাকে মারতেছে। আমার বাবা মাদরাসায় আসছে আমাকে ভয় দেখিয়ে বলতেছে তুই হাসি মুখে থাকবি। আমার ব্যাথার জ্বালায় কান্না আসিতেছিল, আমি কানতাছি। আমার বাবা আসছে পরে হাতে দেখে অনেক মাইরের দাগ। আমার বাবার সন্দেহ হয় আমার বাবা আমার পাঞ্জাবি খুলে দেখে সারা শরীরে মাইরের দাগ। তারপর হুজুরে আমাকে যে মারছে সব বাবার কাছে বলছি।
শিশু মুজাহিদের মা শান্তা বেগম বলেন, হুজুরদের দ্বায়িত্ব বাবা মার মতো করে আদর করে লেখা পড়া করানো। বাবা মার মতো দ্বায়িত্ব নিয়ে লেখাপড়া না করালে আমরা এই ছোট ছোট বাচ্চা কেন দিব। ছেলের বাবা আসছে ছেলেকে দেখতে তখন দেখে ছেলে কান্দে। তার পর জামা কাপড় খুলে দেখে শরীরে অনেক মারধরের দাগ। বেত দিয়ে মারার কারণে শরীরে লাল দাগ হয়ে রয়েছে। এখন আমি সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার ছেলেরে যে মারছে তার বিচার চাই।
পুলিশের হাতে আটকের আগে অভিযুক্ত শিক্ষক নাজমুস সাকিব বলেন, আমি মুজাহিদকে গোসল করতে বলি। সে না শুনায় আমি রাগে তাকে প্রহার করি। এটা আমার ঠিক হয় নাই। এ ঘটনায় আমি ক্ষমা চেয়েছি।
মাদরাসাটির পরিচালক মুফতি মিসবাহ উদ্দিন নোমানী বলেন, ঘটনার সময় আমি নামাজের কারণে মাদরাসায় চিলাম না। পরে এসে বিষয়টি জানতে পারি। আমাদের এখানে শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ। অভিযুক্ত শিক্ষক মাত্র একমাস হয়েছে মাদরাসায় যোগদান করেছে। আমরা বসে স্থানীয় ভাবে বিষয়টি মিমাংসা করি। অভিযুক্ত শিক্ষক ক্ষমা চেয়েছে। তাকে মাদরাসা অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল নরসিংদীর তত্ত্বাবধায়ক ডা: এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, মুজাহিদ নামে ৭ বছরের বাচ্চা হাসপাতালে আসে, দেখা যায় তার পিঠে, হাতে, পায়ে বেঁতের আঘাতের চিহ্ন। শারিরিক ও মানসিক ভাবে ৭ বছরের বাচ্চা অনেক কষ্টের মধ্যে আছে। আমরা সর্বচ্চো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। অবস্থার উন্নতি না হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা রেফার্ড করতে পারি। এমন আঘাত শারিরিক ও মানসিক ভাবে বেশ প্রভাব পড়তে পারে। আশা করা যায় ৫ থেকে ৭ দিনের ভিতর শারীরিক ভাবে সুস্থ হয়ে যেতে পারে।
নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর এম আল-মামুন বলেন, পরিবারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিকেলে অভিযুক্ত শিক্ষককে মাদরাসা থেকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে আইনী প্রক্রিয়া অবলম্বন করে আদালতে পাঠানো হবে।
মন্তব্য করুন